আনোয়ারা ট্রাজেডিঃ গর্ভের সন্তানের মৃত্যু, আইসিইউতে কাউসারের লড়াই
মাটির নিচে ঘুমিয়ে আছে সাত মাসের শিশু, আর হাসপাতালের বিছানায় মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছেন তার মা।
ফটো: সংগৃহীত
আনোয়ারার বারখাইনের ঝিওরি গ্রাম যেন এখন একটি শোকের গ্রামে পরিণত হয়েছে। মাত্র কয়েক সেকেন্ডের একটি সড়ক দুর্ঘটনা। সেই দুর্ঘটনাই ওলটপালট করে দিয়েছে গ্রামটির কয়েকটি পরিবারের পুরো জীবন। একদিকে একই গ্রামের দুই নারী শ্রমিকের প্রাণহানি, অন্যদিকে এখন মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছেন অন্তঃসত্ত্বা এক মা। কিন্তু তাঁর আগেই নিভে গেছে গর্ভে বেড়ে ওঠা সাত মাসের সন্তানের জীবন।
আনোয়ারা কর্ণফুলী টানেল সড়ক চত্বরে ঘটে যাওয়া ভয়াবহ বাস দুর্ঘটনার পর চিকিৎসাধীন অবস্থায় শুক্রবার (৩১ জুলাই) ভোরে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মৃত এক পুত্রসন্তানের জন্ম দেন কাউসার আক্তার। কয়েক ঘণ্টা পরই উপজেলার বারখাইন ইউনিয়নের ঝিওরি গ্রামে ছোট্ট সেই নবজাতককে দাফন করা হয়।
সন্তানের জানাজা ও দাফন শেষে শোকস্তব্ধ বাবা মোহাম্মদ আরিফ আবারও ছুটে যান হাসপাতালে, যেখানে তাঁর স্ত্রী এখনো আইসিইউতে মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছেন।
পরিবারের সদস্যদের কাছে এখন সবচেয়ে বড় দোয়া, অন্তত কাউসার যেন ফিরে আসেন। কারণ ঘরে তাঁর জন্য অপেক্ষা করছে দুটি ছোট্ট সন্তান। বড় ছেলে রাফির বয়স ১০ বছর, আর ছোট মেয়ে তাবাসসুমের বয়স মাত্র ৫। তারা এখনো পুরোপুরি বুঝে উঠতে পারেনি কী ভয়াবহ বিপর্যয়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে তাদের পরিবার। বারবার তারা শুধু মায়ের খোঁজ করছে।
পরিবার সূত্রে জানা গেছে, প্রায় আট বছর ধরে কর্ণফুলী ইপিজেডের একটি পোশাক কারখানায় কাজ করতেন কাউসার আক্তার। প্রতিদিনের মতো বৃহস্পতিবার (৩০ জুলাই) রাতেও কর্মস্থল থেকে বাড়ি ফিরছিলেন তিনি। কিন্তু সেই ফেরা আর স্বাভাবিক হলো না। পথে ভয়াবহ দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত হন তিনি।
কাউসারের শ্বশুর মো. নুরুন্নবী জানান, দুর্ঘটনায় তাঁর পুত্রবধূর মাথায় গুরুতর আঘাত লাগে। এরপর থেকেই তিনি অচেতন অবস্থায় চিকিৎসাধীন রয়েছেন। চিকিৎসকেরা গর্ভের সন্তানকে বাঁচাতে পারেননি। এখন পরিবারের সব আশা একটাই, কাউসার সুস্থ হয়ে যেন তাঁর দুই সন্তানকে আবার বুকে জড়িয়ে নিতে পারেন।
গত বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় আনোয়ারার চাতরী চৌমুহনী বাজারসংলগ্ন কর্ণফুলী টানেল সড়ক মোড়ে অতিরিক্ত গতিতে আসা কোরিয়ান ইপিজেডের (কেইপিজেড) একটি শ্রমিকবাহী বাস নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে সড়কের পাশে যাত্রীদের অপেক্ষমাণ কয়েকটি যানবাহনের ওপর উঠে যায়। বাসটির ধাক্কায় ছয়টি সিএনজিচালিত অটোরিকশা ও একটি রিকশা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। মুহূর্তেই ঘটনাস্থলজুড়ে সৃষ্টি হয় বিভীষিকাময় পরিস্থিতি।
দুর্ঘটনায় ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান নারী শ্রমিক ইফা শীল ও পলি দত্ত। আহত হন অন্তত ২৫ জন। স্থানীয় বাসিন্দারা দ্রুত উদ্ধার অভিযান চালিয়ে আহতদের আনোয়ারা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যান। সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে অন্তত ১৪ জনকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। অন্যদিকে সাতজনকে চিকিৎসা দিয়ে বাড়ি পাঠানো হয়েছে বলে হাসপাতাল সূত্র জানিয়েছে।
দুর্ঘটনার পর কেটে গেছে একদিন। কিন্তু এর আঘাত এখনো বহন করছে একাধিক পরিবার। কারও ঘর থেকে হারিয়ে গেছেন উপার্জনক্ষম সদস্য, কেউ হারিয়েছেন স্ত্রী, কেউবা সন্তান। আর কাউসার আক্তারের পরিবারের জন্য সময় যেন থমকে আছে হাসপাতালের আইসিইউর দরজায়। মাটির নিচে ঘুমিয়ে আছে সাত মাসের শিশু, আর হাসপাতালের বিছানায় মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছেন তার মা।
পরিবারের সদস্যরা বলছেন, এই মুহূর্তে তাঁদের একমাত্র চাওয়া, কাউসার যেন জীবনের এই কঠিন লড়াইয়ে জয়ী হয়ে সন্তানদের কাছে ফিরে আসেন।