বরষা বাদলের গ্রাম
মায়ের চেয়ে দুনিয়ায় আর কোন প্রশস্ত দরজা নাই। গ্রামে রাস্তার মুখে প্রাচীন কাঠের ব্রীজ। ব্রীজটায় এসে প্রায় প্রতিবারই থমকে দাঁড়াই।
বরষা বাদলের গ্রাম | ফটো: কোলাজঃ প্রিয় আনোয়ারা
মিজান ফারাবী
বর্ষা ফুরিয়ে আসছে প্রায়। আকাশ শাদা হয়ে আছে। ধীরে ধীরে শরতের আকাশে রূপ নিচ্ছে। একদম শুভ্র। এই শুভ্রতার মাঝেও কোথাও কোথাও মেঘ জমা হচ্ছে। বর্ষা শেষ হয়ে এলেও মেঘের ঘনঘটা রয়ে গেছে।
উড়ন্ত মেঘ। বর্ষার শেষ দিকে যেখানে মেঘ জমে সেখানেই বৃষ্টি নামে। হঠাৎ করেই ঘনকালো মেঘে অন্ধকার নেমে আসে চারিদিকে কিন্তু বৃষ্টির দেখা নেই। আবার ধীরে ধীরে আকাশ পরিষ্কার হতে থাকে। আজকের বিকেলটা এমনই।
মেঘে মেঘে আকাশের শুভ্রতা ঢেকে গেলো। এলো একপশলা বৃষ্টি। এই বৃষ্টি বেশিক্ষণ থাকেনি। এখন টানা বৃষ্টির সময় না। বর্ষার মাঝামাঝি সময়ে এমন হয়। বৃষ্টির মৌসুমে শুরু এবং শেষটা হালকা বৃষ্টি দিয়ে ফুরিয়ে যায়। ভারী বৃষ্টিও হয় মাঝে মাঝে। এখন এসবের ঠিক নেই, এই বর্ষা তো এই রোদ।
ঋতু বদলের সাথে সাথে কতকিছুই বদলে যায়। বদলে যায় আবহাওয়া। প্রকৃতি ও বৈচিত্র্য। মেঘের উড়ে যাওয়ার সাথে বৃষ্টিও উধাও হয়ে গেলো। বৃষ্টি থামতেই বাড়ি থেকে হালকা পশ্চিমে কদমের ফাঁকে সূর্যের আলো ঝিলিক দিয়ে উঠলো। বৃষ্টি পরবর্তী এই দৃশ্যটা অসম্ভব রকমের সুন্দর। বর্ষায় গ্রামে এমন রূপবৈচিত্র দেখা যায়।
বৃষ্টি থেমে যেতে বাহিরের দোলনায় গিয়ে বসলাম। তখনো টিপটিপ বৃষ্টি পড়ছে। দোলনার পাশে লিকলিকে দাঁড়িয়ে আছে বেলিফুলের গাছটা। কয়দিন আগেই ফুল ফোটা শেষ হলো। পানির ভারে কিছুটা নেতিয়ে আছে। পাতায় বৃষ্টির পানি জমে আছে শিশিরের মতো। টপটপ করে ঝরে পড়ছে মাটি ছুঁয়ে। তার পাশেই ঝোপের মতো হাসনাহেনার গাছ। বৃষ্টির পানিতে চুপসে আছে পুরো গাছটা। ঝর্ণার মতো ঝিরিঝিরি পানি ঝরছে। এই গাছটা আমাকে বেশ মুগ্ধ করে রাখে। সবুজ পাতার মাঝে থোকা থোকা শাদা ফুলের কলি। উঠোনের একপাশে মুগ্ধতা ছড়িয়ে দাঁড়িয়ে আছে গাছটা।
বর্ষায় গ্রামে এলে জলজমিতে হাঁটতে যাই। এবার বালিয়াদির গ্রামে ঘুরে আসছিলাম। গ্রামটা অনেক সুন্দর সেই সাথে বর্ষা মৌসুমটা আরো উপভোগ্য করে তুলেছিলো। নদী ও জলজমির গ্রামটা ছবির মতো। যেন শিল্পীর তুলিতে আঁকা। এসব গ্রামীণ জীবনে আমার বেশ টানে। এই বৃষ্টি নামা দিনে মাছ ধরতে গিয়েছিলাম জমির মাঝে মাঝে থাকা ঘেরে। গ্রামে শৈশব ও কৈশোরে আমাদের এমন দিন ছিলো।
বালিয়াদির বিলে এসে মাছ ধরলাম। কৈশোরের পর থেকে এমন সুযোগ আর হয়নি। গ্রাম দেশে খালের পাশ্ববর্তী জমিগুলো নানান মাছে ভরপুর থাকে। জমির পাশ ধরে বয়ে গেছে বালিয়াদির খাল। এসব খালে জোয়ার-ভাটা হয়। এই যে বিস্তীর্ণ জমির মাঝে মাঝে ঘের আছে এর মধ্যে খাল থেকে জোয়ারের পানিতে নানান মাছ এসে আটকা পড়ে।
বহুবছর বাদে এই গ্রামে এসে কৈশোরের সেই স্মৃতির পুনরাবৃত্তি হলো। এইসব স্মৃতি বুকে বয়ে বাঁচে গ্রামের মানুষ। এখানেই মানুষের মিশে থাকা। আমিও এমন মিশে থাকতে চাই নির্মোহ একটা জীবন নিয়ে। যেমন মিশে আছে গ্রামের মাটি ও মানুষ।
পাহাড়ের গ্রামটা একজীবন মুগ্ধ করে রেখেছে আমারে। আমার কতো কতো শৈশব ও কৈশোরের স্মৃতি এই গ্রামে। গ্রামে ফেরা মানেই আমার মায়ের কাছে ফেরা। বাবা নেই প্রায় সাত বছর হলো। বাবার সেই হাসিমাখা মুখটা আর দেখি না। পৃথিবীর সব বাবারাই এভাবে স্মৃতি রেখে ফিরে যায়।
এখন আমার এই একটি দরজাই খোলা আছে ঘরে ফেরার। মায়ের চেয়ে দুনিয়ায় আর কোন প্রশস্ত দরজা নাই। গ্রামে রাস্তার মুখে প্রাচীন কাঠের ব্রীজ। ব্রীজটায় এসে প্রায় প্রতিবারই থমকে দাঁড়াই। ব্রীজের তল দিয়ে লক্ষীছড়ার ছলছল বয়ে যাওয়া আর গ্রামের ছবি দেখতেই আমার মায়ের মুখ ভেসে ওঠে। আমি মায়ের মুখ দেখতে দেখতে দরজায় হাজির হই।
লেখকঃ কবি ও সাংবাদিক
ঢাকা
মোবাইলঃ ০১৮৩৯৩৩৬৪৫৩