বৃষ্টিভেজা মোনাজাত, রক্তরাঙা বিজয়
সেদিনের সেই কর্মসূচির নাম ছিল 'Remember of Our Heroes'। আমি কেবল সেই একটি দিনই সরাসরি রাজপথে সাধারণ মানুষ আর ছাত্র ভাইদের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দাঁড়িয়েছিলাম।
কোলাজঃ প্রিয় আনোয়ারা
মোহাম্মদ আবদুল হালিম
আমি তখন মাত্র নবম শ্রেণির ছাত্র। চারদিকে এক অস্থির থমথমে ভাব। আমাদের অর্ধ-বার্ষিক পরীক্ষা চলছিল, কিন্তু ছাত্র-জনতার উত্তাল আন্দোলনের কারণে স্কুল অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ হয়ে যায়। ঘরের ভেতর বন্দি থাকলেও মনটা পড়ে থাকত রাজপথে,যেখানে আমার ভাইয়েরা বুকের রক্ত ঢেলে দিচ্ছিল।
দিনটি ছিল ২০২৪ সালের ২ আগস্ট, এক ঐতিহাসিক শুক্রবার। আগের রাত থেকেই মুষলধারে বৃষ্টি হচ্ছিল, যেন আকাশও দেশের এই ক্রান্তিলগ্নে কাঁদছিল। গতকাল বাসায় আসা দুলাভাই আমাকে আচমকা জিজ্ঞেস করলেন, "আন্দোলনে যাবে?" আমার বুকে তখন এক অদ্ভুত কাঁপন, এক সেকেন্ডও দেরি না করে অবলীলায় বলে উঠলাম, "হ্যাঁ, যাব!"
সকাল ১১টা ৪০ মিনিটে যখন বাসা থেকে বের হচ্ছি, তখনো তুমুল বৃষ্টি। আম্মুকে বানিয়ে বললাম, "আমরা বড় একটা মসজিদে জুম্মার নামাজ পড়তে যাচ্ছি।" সত্যি কথা বললে আম্মু হয়তো এই বৃষ্টির মধ্যে বুকভরা আতঙ্ক নিয়ে যেতে দিতেন না। মায়ের সেই মিথ্যে বলার অপরাধবোধটুকু তখন দেশের প্রতি ভালোবাসার কাছে হেরে গিয়েছিল।
তুমুল বৃষ্টি মাথায় নিয়ে বেলা ১টা ১০ মিনিটে আমরা পৌঁছালাম চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী আন্দরকিল্লা শাহী জামে মসজিদে। বৃষ্টির তীব্রতা ছাপিয়ে তখন মানুষের ঢল। মসজিদের ভেতরে তিল ধারণের ঠাঁই নেই, তাই বাধ্য হয়ে বাইরের বারান্দায় বৃষ্টির ছাট গায়ে মেখেই দাঁড়িয়ে গেলাম। কিছুক্ষণ পর খতিব সাহেব যখন আরবীতে সেই জ্বালাময়ী খুতবা শুরু করলেন, আমার শরীরের লোম খাড়া হয়ে গেল। চারপাশ তাকিয়ে দেখলাম, শত শত মানুষ বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে দুহাত তুলে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছেন আর আল্লাহর দরবারে মোনাজাত করছেন যেন এই প্রিয় বাংলাদেশ স্বৈরাচারের হাত থেকে মুক্তি পায়।
আমরা জানি, খুতবার সময় এবং বৃষ্টির মাঝে দোয়া কবুলের এক বিশেষ মুহূর্ত। সেদিন চট্টলাবাসীর চোখ থেকে ঝরে পড়া অশ্রু আর আকাশের বৃষ্টির ফোঁটা এক হয়ে এক অলৌকিক আর্তি তৈরি করেছিল। হয়তো সেই নিষ্পাপ, আকুল প্রার্থনার জোরেই এর মাত্র তিন দিন পর বাংলাদেশ এক অবিশ্বাস্য মুক্তি দেখেছিল।
বৃষ্টিতে ভিজেই জুম্মার নামাজ শেষ করলাম। এরপর শুরু হলো জুলাইয়ের বীর শহীদদের আত্মার মাগফিরাত কামনা করে দোয়া। নামাজ শেষে পুরো মসজিদ যেন এক জীবন্ত আগ্নেয়গিরি হয়ে উঠল। 'আল্লাহু আকবার' তাকবির ধ্বনিতে মুখরিত হয়ে বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে সবাই মসজিদের উত্তর গেট দিয়ে বের হলাম। মিছিলটি যখন আন্দরকিল্লা মোড়ে পৌঁছাল, দেখলাম সেখানে শতাধিক পুলিশ ও বিজিবি অস্ত্র হাতে মুখোমুখি দাঁড়িয়ে। কিন্তু সেদিন কারও চোখে ভয় ছিল না। পুরো জনসমুদ্র একস্বরে পুলিশকে লক্ষ্য করে 'ভুয়া ভুয়া' স্লোগানে চারপাশ কাঁপিয়ে তুলল।
মিছিলটি লালদিঘী হয়ে নিউ মার্কেটের দিকে এগোচ্ছিল। ঠিক লালদিঘীর কাছাকাছি গিয়ে দুলাভাই আবিষ্কার করলেন উনার মোবাইল ফোনটি পকেটমার হয়ে গেছে! ফোনের চেয়েও বড় চিন্তা ছিল, বাসায় যোগাযোগ করতে না পারলে আম্মু ভীষণ দুশ্চিন্তা করবেন। তাই বাধ্য হয়ে সেই ঐতিহাসিক মিছিলের স্রোত থেকে মন খারাপ করে আমাদের ফিরে আসতে হলো।
সেদিন অতক্ষণ বৃষ্টিতে ভেজার কারণে পরদিন আমার তীব্র সর্দি, ঠান্ডা আর গায়ে জ্বর চলে এলো। কিন্তু এর মাত্র তিন দিন পর, ৫ই আগস্ট যখন টেলিভিশনে স্বৈরাচারের পতনের খবর শুনলাম, তখন এক নিমিষেই আমার সব অসুস্থতা আর দুলাভাইয়ের মোবাইল হারানোর দুঃখ কর্পূরের মতো উড়ে গেল। রাজপথে নেমে এলো লাখো মানুষের বাঁধভাঙা উল্লাস।
সেদিনের সেই কর্মসূচির নাম ছিল 'Remember of Our Heroes'। আমি কেবল সেই একটি দিনই সরাসরি রাজপথে সাধারণ মানুষ আর ছাত্র ভাইদের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দাঁড়িয়েছিলাম। জীবনের প্রথম এক ঐতিহাসিক বিপ্লবের অংশ হতে পারার সেই রোমাঞ্চ, সেই বৃষ্টিভেজা অশ্রু আর আন্দরকিল্লার সেই অভূতপূর্ব মোনাজাত আমার হৃদয়ে চিরদিনের জন্য খোদাই হয়ে থাকবে। আমি গর্বিত, আমি স্বাধীন বাংলাদেশের একজন নাগরিক।
শিক্ষার্থী
বটতলী শাহ মোহছেন আউলিয়া (রা.হ) এয়াকুবিয়া আলিম মাদরাসা।