আনোয়ারায় বালু সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্যঃ ভাঙছে নদীর পাড়, ঝুঁকিতে হাজারো মানুষের ঘর-বাড়ী
বিচ্ছিন্নভাবে অভিযান পরিচালনা করে এসব অপরাধীদের বিরুদ্ধে কোন প্রতিরোধ সম্ভব নয়, অবৈধ বালু উত্তোলনের পুরো নেটওয়ার্ক শনাক্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।
বালু উত্তোলনের কারনে ইছাখালীতে দেখা দিয়েছে তীব্র ভাঙন | ফটো: সংগৃহীত
রাত গভীর হলে সাঙ্গু নদীর তীরে শুরু হয় এক ভিন্ন কর্মযজ্ঞ। নদীর বুক চিরে গর্জে ওঠে ড্রেজার, অন্ধকারে সারিবদ্ধভাবে চলতে থাকে বালুবোঝাই ট্রাক। ভোর হওয়ার আগেই লাখ লাখ টাকার বালু চলে যায় বিভিন্ন গন্তব্যে। আর পেছনে রেখে যায় ক্ষতবিক্ষত নদীতীর, ভাঙনের আতঙ্ক আর অনিশ্চয়তায় থাকা হাজারো মানুষকে।
আনোয়ারা উপজেলায় দীর্ঘদিন ধরে চলা অবৈধ বালু উত্তোলন এখন পরিবেশগত সংকটের পাশাপাশি জননিরাপত্তার জন্যও বড় হুমকি হয়ে উঠেছে। বালু উত্তোলনের বিরুদ্ধে আনোয়ারার জনপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল প্রিয় আনোয়ারায় একাধিক প্রতিবেদন প্রকাশ করলেও টনক নড়ছে না প্রশাসনের।
স্থানীয়দের অভিযোগ, সরকারি কোনো অনুমোদিত বালুমহাল না থাকলেও উপজেলার বিভিন্ন নদী, খাল ও উপকূলীয় এলাকা থেকে প্রকাশ্যেই বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। মাঝে মধ্যে প্রশাসনিক অভিযান হলেও কয়েকদিন পর আবারও আগের অবস্থায় ফিরে যায় পরিস্থিতি।
সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়েছে সাঙ্গু নদীর তীরবর্তী এলাকাগুলো। জুঁইদণ্ডী, বরুমছড়া, বারখাইন রায়পুরের গহিরা, বৈরাগ ও হাইলধর ইউনিয়নের ইছাখালীর অনেক পরিবার নদীভাঙনের আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য, এক সময় যে জমিতে ধান, সবজি ও নানা ফসল উৎপাদিত হতো, তার অনেক অংশ এখন নদীগর্ভে হারিয়ে গেছে। কোথাও কোথাও বসতবাড়ির উঠান পর্যন্ত নদীর কিনারায় এসে ঠেকেছে।
জুঁইদণ্ডীর এক বাসিন্দা বলেন, “নদী প্রতি বছর একটু একটু করে ভাঙত। কিন্তু গত কয়েক বছরে ভাঙনের গতি অনেক বেড়ে গেছে। রাতে বালু তোলার পর সকালে দেখা যায় নদীর পাড়ের নতুন অংশ ধসে পড়েছে।”
স্থানীয়দের দাবি, বালু উত্তোলনের কারণে নদীর স্বাভাবিক গতিপ্রকৃতি বদলে যাচ্ছে। নদীর তলদেশে ভারসাম্য নষ্ট হওয়ায় বিভিন্ন স্থানে তীব্র স্রোতের সৃষ্টি হচ্ছে, যা তীররক্ষা বাঁধ ও অবকাঠামোর ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি করছে। ইতোমধ্যে কয়েকটি এলাকায় বেড়িবাঁধ ও সড়ক সুরক্ষা কাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
বৈরাগ এলাকার বাসিন্দারা জানান, নদী ও খাল থেকে অবাধে বালু তোলার কারণে কিছু স্থানে সড়কসংলগ্ন গাইড ওয়াল ও ড্রেনেজ অবকাঠামো দুর্বল হয়ে পড়েছে। এতে বর্ষা মৌসুমে বড় ধরনের ক্ষতির আশঙ্কা করছেন তারা।
অবৈধ বালু উত্তোলনের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে স্থানীয়দের অভিযোগ আরও গুরুতর। তাদের দাবি, এ ব্যবসার পেছনে প্রভাবশালী মহলের আশ্রয়-প্রশ্রয় রয়েছে। রাজনৈতিক পরিবর্তন ঘটলেও মাঠপর্যায়ে বালু বাণিজ্যের নিয়ন্ত্রণ কাঠামোতে দৃশ্যমান পরিবর্তন আসেনি। বিভিন্ন সময়ে স্থানীয় জনগণ অভিযোগ তুললেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয় না বলে তাদের অভিযোগ।
প্রশাসনের বিরুদ্ধে অভিযোগ
উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় প্রশাসন ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে জরিমানা ও সরঞ্জাম জব্দের পদক্ষেপ নিয়েছে। তবে স্থানীয়দের একাংশ মনে করেন, এসব অভিযান সমস্যার স্থায়ী সমাধান আনতে পারছে না। তাদের ভাষায়, “যারা কোটি টাকার ব্যবসা করে, তাদের জন্য কয়েক লাখ টাকার জরিমানা তেমন কোনো শাস্তি নয়।”
স্থানীয় পরিবেশ সচেতন ব্যক্তিরা বলছেন, শুধু বিচ্ছিন্নভাবে অভিযান পরিচালনা করে এসব অপরাধীদের বিরুদ্ধে কোন প্রতিরোধ সম্ভব নয়, অবৈধ বালু উত্তোলনের পুরো নেটওয়ার্ক শনাক্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।
একই সঙ্গে নদীভাঙনপ্রবণ এলাকায় জরুরি ভিত্তিতে তীররক্ষা প্রকল্প বাস্তবায়ন এবং পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়নেরও দাবি জানিয়েছেন তারা।
এদিকে পরিস্থিতি নিয়ে ক্ষোভ বাড়ছে সাধারণ মানুষের মধ্যে। বিভিন্ন এলাকায় নাগরিক উদ্যোগে নদী ও পরিবেশ রক্ষায় জনমত গঠনের কাজ শুরু হয়েছে।
স্থানীয়রা বলছেন, সাঙ্গু নদী শুধু নদী নয়, এটি আনোয়ারার কৃষি, জীবিকা ও জনপদের অস্তিত্বের সঙ্গে জড়িত। নদীকে রক্ষা করা না গেলে ভবিষ্যতে আরও বড় মানবিক ও পরিবেশগত সংকট তৈরি হতে পারে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধে কঠোর নজরদারি, স্বচ্ছ তদন্ত, রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত আইন প্রয়োগ এবং জনসম্পৃক্ত উদ্যোগ একসঙ্গে কার্যকর না হলে আনোয়ারার নদী ও উপকূলীয় জনপদকে রক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়বে।