য্যামনে নাচাও, ত্যামনে নাচি
য্যামনে নাচাও, ত্যামনে নাচি | ফটো: প্রিয় আনোয়ারা
মানিকের বন্দোপাধ্যায়ের দারুণ ও বহুলপঠিত একটি উপন্যাসের নাম 'পুতুলনাচের ইতিকথা'। অনেকগুলো কারণে এ উপন্যাসটি আমার বেশ প্রিয়। বন্ধুতালিকায় আরো অনেকের প্রিয়ের তালিকায় এ উপন্যাসটি আছে। প্রায় অনেকেই এ উপন্যাসের মূল বক্তব্যের সারসংক্ষেপ হিসেবে যে কথাটি বারবার বলে থাকেন, তা হলো, আমরা সবাই পুতুল, এবং এই জগতের বাইরের কেউ আমাদের হাতেপায়ে অদৃশ্য সুতো পরিয়ে নাচিয়ে নিয়ে ঘটনাপ্রবাহ এগোচ্ছেন।
যদিও এই উপন্যাসের একটা অংশ প্রমাণ করে, আমরা সকলেই একেকটা পুতুল এবং আমাদেরকে কেউ একজন নাচাচ্ছেন - এই দর্শনে মানিক বিশ্বাসী ছিলেন না। বস্তুত, তিনি এ উপন্যাসে এই দর্শনটি প্রমোটও করতে চাননি।
বরং উপন্যাসের অনেক অংশে এটাই বুঝতে পারা যায়, আমাদের জীবনের বেশ কিছু ঘটনাপ্রবাহ আমাদের নিজেদের কিছু জেদ-ক্ষোভ-ভুল কিংবা ঝুঁকি-একাগ্রতা-ভালোবাসা থেকেই ঘটে থাকে; এমনকি অন্যের করা পদক্ষেপ থেকেও আমাদের জীবনের বহু ঘটনাপ্রবাহ মোড় নেয়।
আমাদের জীবনে ঘটা ঘটনাগুলোর জন্যে আমরা মানুষেরাই দায়ী - মানিক বরং এই দর্শনে বিশ্বাসী ছিলেন। কখনও সেই মানুষটা হই আমি নিজে, কখনও ভিন্ন কেউ। কিন্তু আমাদের সাথে ঘটা যাবতীয় দুর্বোধ্য সংকটের ব্যাখ্যা আমরা ফুটিয়ে তুলতে পারি না বলেই নিজেদেরকে পুতুল ভাবতে ভালোবাসি, আর জগতের বাইরের কোনো সত্ত্বাকে নিয়ন্ত্রক কল্পনা করে নিজের জীবনের ঘাত-প্রতিঘাতের সমস্ত দায় সেই নিয়ন্ত্রকের ঘাড়ে চাপিয়ে দিয়ে স্বস্তি পেতে চাই।
পাঠক হিসেবে মানিকের চরিত্র নির্মাণের কৌশলকে ভালোবাসার অন্যতম কারণ, তাঁর চরিত্রগুলো পুরো গল্পজুড়ে নিজেদের বিশেষ কিছু একটা ভাবতে ভাবতে একটা পর্যায়ে আবিষ্কার করে তারা মিডিওকার বা গড়পড়তার মানুষ ছাড়া আর কিছুই নন। তখনই তারা বহুমুঠো হতাশা বা আত্মগ্লানিতে ডুবে যায়। সাধারণ মানুষের প্রতি মানিকের পর্যবেক্ষণ এখানেই তীক্ষ্ণ, এখানেই বাস্তব, এখানেই ট্র্যাজিক।
যারা উপন্যাসটি পড়েছেন, তাদের জিজ্ঞাসা করছি - কুসুম শুরুতে কেন শশীর প্রতি উতলা ছিল আর শেষে কেন রাজি হয়নি, জানেন? আত্মসম্মান নয়, বরং এই সময়ের মাঝেই সে তার অল্প বয়সের আবেগটা কাটিয়ে ওঠেছিল, পেহ্লাদের একঘেয়ে সংসারে আরো অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছিল। শুরুতে কুসুম বলেছিল, "আপনার কাছে আসলে আমার শরীরটা এমন করে কেন ছোটবাবু?" তার মানে একটা কিশোরীসুলভ মেনস্ট্রুয়াল পর্যায়ের মাঝ দিয়েই যাচ্ছিল বেচারি কুসুম। সে তখন নিশ্চয়ই কৈশোরের শেষপর্যায় কিংবা যৌবনের প্রারম্ভে অবস্থান করছিল, যখন মনের চেয়ে শরীরই বেশি উজ্জীবিত থাকে।
অতঃপর কয়েকটি বছর অতিবাহিতের পর তার পরিপক্কতার কারণেই সে বুঝতে পারল, শশীর সাথে তার আসলেই বনবে না। শশী যদিও বলেছিল, "শরীর শরীর, তোমার মন নেই কুসুম?" কিন্তু এই মনেরও অজস্র অমিল হত কুসুম-শশীর দাম্পত্য জীবনে। কারণ শশী এই গ্রামের ছেলে হলেও সে নিজেকে মনে মনে কলকাতার বাবু সাহেবই মনে করে, যেহেতু সে একজন ডাক্তার - অর্থাৎ শিক্ষিত। কুসুম তা নয় কিন্তু। শশীই পরে মেনে নিতে পারত না কুসুমের সাথে তার শিক্ষাদীক্ষা ও আত্মপরিচয়ের এই দূরত্বটুকু। সে তো আর কুমুদের মতো এডভেঞ্চারপ্রিয় নয়।
"তোমার মন নেই কুসুম"-এই কথার মাঝে কি শশী নিজেকে সম্পূর্ণ যৌনবিকারমুক্ত দাবী করতে চেয়েছে? আমরা নিজেরা যেমনটা করে থাকি প্রায় আলাপে। মানবতা, উদারতা দেখাতে আমরা প্রায়ই নিজেদের স্বরূপটা ঢেকে রাখি। কেন রাখি? অন্যের আস্থা অর্জনের জন্যে, অন্যের কাছে একটু বিশেষ হয়ে ওঠার জন্যে। শশীও কি তা-ই করতে চেয়েছে?
কুমুদ-মতির জীবনের শুরুটা খুব থ্রিলিং। কিন্তু সেটাও কি সুন্দর পূর্ণতা পাওয়ার সম্ভাবনা ছিল? কুমুদ-মতির সংসারজীবনের কিছুটা ছটা কিন্তু মানিক এই উপন্যাসে এনেছেন। সেখানে নাগরিক জীবনের সাথে মতির খাপ খাওয়াতে না-পারার কষ্টটা কিন্তু স্পষ্ট হয়েছে। মতি ফিরে আসতে চেয়েছিল কিছুদিনের জন্যে। সে ফিরেও আসে কুমুদের সাথে। শেষ মুহূর্তে কুমুদকে শহরের ট্রেনে বিদায় দিতে গিয়ে সে নিজেও টুপ করে ট্রেনে ওঠে পড়ে। ট্রেন এগোতে থাকে, কিন্তু তাদের গল্প এগিয়ে নিতে মানিক আর আগান না। একটা সম্ভাবনা কিংবা আশঙ্কার মাঝেই পাঠককে ফেলে দেন।
কুমুদ-মতির নাগরিক জীবনে কি নিশ্চিন্ততা এসেছে নাকি কৃত্রিমতার চাপে যান্ত্রিকতা এসেছে, এর কাছাকাছি উত্তর পেতে 'শহরবাসের ইতিকথা' উপন্যাসটি পড়তে পারেন। এটা এর সিক্যুয়েল নয়, এর চরিত্রগুলো সম্পূর্ণ আলাদা। তবে এই উপন্যাসের চরিত্রেরা গ্রাম থেকে কলকাতা শহরে পাড়ি জমায় শহুরে সভ্য হিসেবে নামায়িত হবার অভিপ্রায়ে।
'পুতুলনাচের ইতিকথা' উপন্যাসটির কপাল তাই খারাপ। প্রচুর পাঠক একে গ্রহণ করেছেন, কিন্তু এর নির্যাসটুকু অনুভব করতে পারেননি। অনেকক্ষেত্রে চরিত্রগুলোকে ভুল বুঝেছেন। এটা পাঠকের ত্রুটি -এমনটা বলব না। আমাদের পারিপার্শ্বিকতা আমাদের এমনভাবে আষ্ঠেপৃষ্ঠে নিয়েছে যে, আমরা গভীরতার সাথে ভাবতে শিখছি না, শুধু বাইরের ব্যাখ্যা নিচ্ছি, আর একটা নির্দিষ্ট ছাঁচে ফেলে যে কোনো কাল্ট ক্ল্যাসিককে অনুধাবনের চেষ্টা করছি। অথচ ভুলে যাচ্ছি বৃত্তের বাইরেও কিন্তু জগত আছে। সে জগত আয়তাকারের, সে জগত বর্গক্ষেত্রের। এর বাইরে আমরা ভাবতে শিখছি না, কারণ আমাদের শেখানো হচ্ছে না। আমরা শুধু ইনফরমেশন শিখছি, ডেফিনিশন শিখছি; সেগুলোকে প্রয়োগ করার আর্ট আমরা শিখছি না।
এই আর্ট শেখানোর মতো উপযুক্ত শিক্ষক কই? আমাদের মহান শিক্ষকেরা বলে বেড়ান, "আজ নজরুল বেঁচে থাকলে অগ্নিবীণা উৎসর্গ করত 'অমুক' রাজনৈতিক নেতাকে।" এই শিক্ষকদের কাছ থেকে আমরা কী করে আর্ট-ফিলোসফি শিখব! ভাবনাচিন্তায় সেগুলো প্রয়োগ করা তো দূর কি বাত!
সবার জন্যে বই পড়া জরুরীও নয়। সবাইকে মানিকের 'পুতুলনাচের ইতিকথা'ও পড়া লাগবে না, বিভূতির 'পথের পাঁচালি'ও পড়া লাগবে না। সত্যিকারের কুসুম-সর্বজয়ারা কখনও কাল্ট ক্ল্যাসিক পড়েনি, কিন্তু জীবনের জটিলতা দেখেছে, অনুভব করেছে, সে অনুপাতে সিদ্ধান্ত নিয়ে নিজেকে ও নিজের সম্মানকে রক্ষা করতে শিখেছে।
তাহলে বুঝতে পারা গেল সমাধান কীসে আছে। যে কোনো জবে ইন্টারভিউ দিতে গেলে একটা কথাই তাঁরা বলেন, "আপনাকে ফিল্ডে কাজ করতে হবে!" আশফাক নিপুন 'মহানগর' নামক যে ওয়েব সিরিজটি ‘বানিয়েছেন’, সেটির প্রথম সিজনের একটি দৃশ্যে ওসি হারুন তাঁর অধীন পদস্থ মলয়ের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে বলেন, "আমি বই পড়ে ওসি হইনি, ফিল্ডে কাজ করে ওসি হয়েছি।" তাহলে জীবনকে উপলব্ধি করতে ফিল্ডে কেন কাজ করব না? সেভাবে ফিল্ডে নামিনি বলেই তো আমরা উপন্যাসগুলোর ব্যাখ্যা গতানুগতিকতার মাঝেই মেলে ধরছি।
আমাদের অনেক সংকট রয়ে গেছে, বুঝলেন? রুচির সংকট নিয়ে তো নাট্যমঙ্গলের লোকজন ত্যানা পেঁচিয়ে গেছেন। এর বাইরে আরো বহুবিধ জৈবনিক সংকটে আমরা আক্রান্ত। সংকট ভুলতে "হাজার বিজ্ঞাপন শত মনোরঞ্জন, জীবনের যন্ত্রণা থাক না ভুলে" নীতি অবলম্বন করছি। এত চিপায় পড়ে গিয়ে "তবুও টিভিস্ক্রিনে খেলার বিরাম নেই!"
সবকিছু থেকে গা বাঁচিয়ে চলতে গেলেও ত্রাসসঞ্চারি মহামারীর মতো কিন্তু বহু বিপদ, বহু বিপন্ন মুহূর্ত আমাদেরকে ঘিরে ধরতে এগিয়ে আসছে। আমরা তো জ্যাক অব অল ট্রেডস, তাই বিভিন্ন খাত সম্পর্কে শুধু বেসিকটাই জানি, ভেতরটা জানি না। সেটা অর্থনীতি থেকে শুরু করে পণ্যবাজারের বিজ্ঞাপননীতি - সবখানেই আমাদের জ্ঞানের সংকট।
তাই কতিপয় নীতিনির্ধারক কাম 'রাষ্ট্রীয়' ডাকাতেরা আমাদের এই অজ্ঞতার সুযোগ নিয়েই প্রতিনিয়ত ঠকিয়ে যাচ্ছেন। আর আমরা হেলমেট পরে হলেও প্রতিনিয়তই বেলতলায় যাচ্ছি। কারণ আমাদের চিন্তা একটি ছাঁচে আটকে গেছে যে, উল্টোগীত গাইলে মারা পড়তে হবে। মারা তো পড়ছিই, তিলে তিলে মরছি। ভাতের হোটেলে দুইবেলা ঘুরে এলে দেখি ফস করে ৫০০ টাকা খসে পড়েছে। এই মরণ শুধু শ্যামসমানই নয়, আকালেরও সমান!
'পুতুলনাচের ইতিকথা'য় মানিকের বয়ানে জানতে পারি, শশীর কল্পনাময় অংশটুকু গোপন ও মূক। অত্যন্ত ঘনিষ্ঠভাবে তার সাথে না মিশলে তার এই কল্পনাময়িতার পরিচয় পাওয়া যাবে না। শশীর তবু সংসারে টিকে থাকার পক্ষের কিছু দরকারি গুণ ছিল।
আমাদের দেখছি তাও নেই। কুসুমের চরিত্রের দুটি ভাগের দ্বিতীয়টির মতো পরিপক্বতাও আমাদের নেই। সে কারণেই হাল আমলের নিব্বা-নিব্বি থেকে শুরু করে শিক্ষক-ছাত্রীদের ইনবক্সিয় এক্সপোজের গল্প প্রতিদিন হাতে হাতেই চলে আসছে।
লে হালুয়া, সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে থাকা এতসব এক্সপোজিভ গল্পের চোটে আমাদের আর কাল্ট ক্ল্যাসিক পড়া লাগবে না।
বাইরের কোনো সত্ত্বা আমাদের নাচাচ্ছেন কি না, ও নিয়ে মাথা ঘামাচ্ছি না। তবে প্রতিনিয়ত আমাদের পেছনে মুলিবাঁশের আগমন-নির্গমনকারীরা যে আমাদের নাচিয়ে যাচ্ছেন, সে ব্যাপারে আমি শতভাগ না, সহস্রভাগ নিশ্চিত। আসুন, হাত ধরুন, কোমরটাও চেপে ধরুন, আমরা জীবনের যন্ত্রণা ভুলে গিয়ে নাহয় একত্রে নাচি। সূত্রধরেরা ব্যাকগ্রাউন্ড থেকে আমাদের সংলাপ ডাবিং করুক।
গল্পকার, অনুবাদক
যোগাযোগঃ ০১৮৩৫৮২৫৪৭৪