ব্রেকিং
‘বড় দল’ হতে গিয়ে জামায়াতে নজিরবিহীন বিশৃঙ্খলা পুলিশের রহস্য উদঘাটনঃ ধারের টাকা ও স্ট্যাম্পের জেরে আনোয়ারায় মা-মেয়ে খুন আনোয়ারায় মা-মেয়ে খুনঃ ২৪ ঘণ্টার মধ্যে প্রধান ঘাতক তেজ গ্রেফতার, রক্তমাখা ছুরি ও মোবাইল উদ্ধার ইসলামী ব্যাংকের পর্ষদ ভেঙে দিল বাংলাদেশ ব্যাংক, সব পরিচালকের নিয়োগ বাতিল পাওনা টাকার লিখিত স্ট্যাম্প হাতিয়ে নিতেই আনোয়ারায় মা-মেয়ে হত্যাঃ অভিযোগ গৃহকর্তার নারী সংসদ সদস্যদের পোশাক নিয়ে মন্তব্য বর্ণবাদীঃ নাহিদ ইসলাম দুবাইতে গ্রেপ্তার সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদ আনোয়ারায় ঘরে ঢুকে মা-মেয়ের নৃশংস হত্যাকাণ্ড, মৃত্যুর আগে ঘাতকের নাম জানালেন স্ত্রী সরকার জনগণের ৭০ শতাংশ মানুষের রায় উপেক্ষা করছেঃ চট্টগ্রামে ডা. শফিকুর রহমান গুজবের ফাঁদে প্রধানমন্ত্রীঃ ভুয়া ফটোকার্ডের তথ্যে সংসদে বিরোধী দলকে টার্গেট ‘বড় দল’ হতে গিয়ে জামায়াতে নজিরবিহীন বিশৃঙ্খলা পুলিশের রহস্য উদঘাটনঃ ধারের টাকা ও স্ট্যাম্পের জেরে আনোয়ারায় মা-মেয়ে খুন আনোয়ারায় মা-মেয়ে খুনঃ ২৪ ঘণ্টার মধ্যে প্রধান ঘাতক তেজ গ্রেফতার, রক্তমাখা ছুরি ও মোবাইল উদ্ধার ইসলামী ব্যাংকের পর্ষদ ভেঙে দিল বাংলাদেশ ব্যাংক, সব পরিচালকের নিয়োগ বাতিল পাওনা টাকার লিখিত স্ট্যাম্প হাতিয়ে নিতেই আনোয়ারায় মা-মেয়ে হত্যাঃ অভিযোগ গৃহকর্তার নারী সংসদ সদস্যদের পোশাক নিয়ে মন্তব্য বর্ণবাদীঃ নাহিদ ইসলাম দুবাইতে গ্রেপ্তার সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদ আনোয়ারায় ঘরে ঢুকে মা-মেয়ের নৃশংস হত্যাকাণ্ড, মৃত্যুর আগে ঘাতকের নাম জানালেন স্ত্রী সরকার জনগণের ৭০ শতাংশ মানুষের রায় উপেক্ষা করছেঃ চট্টগ্রামে ডা. শফিকুর রহমান গুজবের ফাঁদে প্রধানমন্ত্রীঃ ভুয়া ফটোকার্ডের তথ্যে সংসদে বিরোধী দলকে টার্গেট
সাহিত্য

ত্রাণ লুট

আরিফ শাওন ১৩ মে ২০২৬ বিকাল ৭:৪৮ সময়
ত্রাণ লুট

ত্রাণলুট | ফটো: প্রিয় আনোয়ারা

শমশের চেয়ারম্যান মেডিকেলের বেডে শুয়ে আছেন। শুয়ে আছেন একা। গ্লাসের একটা রুমে। সেখানে ডাক্তাররা সাদা পোশাক পরে সারা শরীর ঢেকে আসে। এইসব দেখতে শমশের চেয়ারম্যানের বিরক্তিকর লাগে। তিনি এসেছেন একটা রাত পার হলো। মেডিকেলের দেওয়ালে ডিজিটাল ঘড়ি দেখা যাচ্ছে। এখন দুপুর এগারোটা চব্বিশ।

শমশের চেয়ারম্যান হালকা চিন্তিত। মানুষ এরকম দয়া-মায়াহীন হয়ে যাবে ভেবেই চিন্তাটা আরও বেড়ে গেল। গতরাত থেকে এখন পর্যন্ত কেউ তাঁকে দেখতে আসেনি। খোঁজখবরও নেয়নি কেউ। ডাক্তাররা আসছেন শুধু। এসে কাজ সেরে চলে যাচ্ছেন। কথা বলা যায় না। তাঁরা কি জানেন না তিনি শ্যাওলাপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান? পরিবেশ, একাকীত্ব আর শরীরের অবস্থার কথা চিন্তা করে বড়ই অস্বস্তিকর লাগছে শমশের চেয়ারম্যানের। মনে হচ্ছে, শরীরের অবস্থা অবনতির আগেই তিনি মারা যাবেন। এবং মারা যাওয়াটাই উত্তম বলে মনে হচ্ছে তাঁর কাছে।

মৃত্যুর কথা চিন্তা করতেই বুকটা ধক করে ওঠে। তিনি যদি এখন মারা যান তাহলে হিসাব-নিকাশ সব এলোমেলো হয়ে যাবে। তাঁর এখন মারা যাওয়াটা মোটেও উচিত হবে না। সরকার ত্রাণ দিয়েছে গরিব মানুষের দেওয়ার জন্য। সেই ত্রাণ দেওয়া হয়েছে চার ভাগের একভাগ। বাকি সব লতিফ আরতদারের সাথে চুক্তি। সমস্যা হচ্ছে, বস্তা তাঁর আরতেই আছে। কিন্তু হিসাব-নিকাশ শেষ হয়নি। আরও গুরুতর সমস্যা হচ্ছে, এই চুক্তি সম্পর্কিত কোনো খবর কেউ জানে না লতিফ আরতদার ছাড়া। এখন মনে হচ্ছে, তিনি একটা ভুল করে ফেলেছেন। চুক্তির খবরটা বড় ছেলে শফিকের কাছে বলা দরকার ছিল। এখন বললেও মোটামুটি লাভ যা হওয়ার হতো। কিন্তু কেউ তো আসছে না এখানে। শমশের চেয়ারম্যানের অস্থিরতা বেড়ে যাচ্ছে। তিনি চটফট করছেন ত্রাণ আর লতিফ আরতদারের চুক্তিবিষয়ক চিন্তায়। এই মুহূর্তে খবরটা জানাতে না পারলে লতিফ আরতদার সব একাই লুটেপুটে খাবে।

করোনা ভাইরাসের কারণে পুরো দেশ লকডাউন। সংক্রমণের মাত্রা বেশি। প্রতিদিন আক্রান্ত আর মৃতের সংখ্যা বাড়ছে হুড়হুড় করে। সরকারের বেহিসাব ক্ষতি হচ্ছে। গরিবরা না খেয়ে মারা যাবার সম্ভাবনাটা বেশি। সরকার তাই গরিবদের ত্রাণ দিচ্ছে। এই ত্রাণ বিতরণের দায়িত্ব পড়েছে ইউনিয়ন চেয়ারম্যান, মেম্বারদের হাতে। শমশের চেয়ারম্যান এই ত্রাণ বিতরণ করতে বেশ দৌড়ঝাঁপ করেছেন। এই দৌড়ঝাঁপ করতে গিয়ে মানুষের জনসমাগম এড়াতে পারেননি। সরকার যদিও বারবার বলছে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখতে, কিন্তু সেটা করতে গেলে শমশের চেয়ারম্যান যে জনদরদী এটা আর মানুষ বুঝবে না। না বুঝলে সামনের নির্বাচনে ভোট পাওয়া যাবে না। এই ছোটখাটো পলিটিক্স না বুঝলে রাজনৈতিক নেতা হওয়া যায় না।

ত্রাণ বিতরণের সময় দলবল ভারি করে বের হয়েছিলেন। তিনি মানুষের সাথে হ্যান্ডশেক, কোলাকুলি বাদ দেননি। ত্রাণ বিতরণের ছবি তুলতে গিয়ে রীতিমতো দলীয় লোকজনের ঠেলাঠেলি, ধাক্কাধাক্কিতে গিজগিজ অবস্থা। মনে হচ্ছে, এই প্রথম তারা ত্রাণ বিতরণের সুযোগ পেয়েছে। ত্রাণ যাকে দেওয়া হচ্ছে সে যতটুকু না খুশি তার চেয়ে বেশি খুশি যারা ত্রাণ দিচ্ছে তারা। আনন্দোৎসব চলছে। ত্রাণ দেওয়ার পরপরই জোরেশোরে হাততালি দিচ্ছে দলীয় লোকজন। স্লোগানও দিচ্ছে গলা ফাটিয়ে।

ত্রাণ বিতরণের দুদিন পর থেকে শমশের চেয়ারম্যানের জ্বর, সর্দি, কাশি শুরু হয়। এ খবর পেয়ে দলীয় লোকজন দেখতে এসেছে দলে দলে। বড় ছেলে শফিক এসব দেখে বিরক্ত হলেও কিছু বলতে পারছে না। সে ডাক্তারি পড়ছে, এবার থার্ড ইয়ারে। কলেজ বন্ধ হওয়াতেই সে বাড়ি এসেছে। তার বাবার এসব কার্যক্রম মারাত্মক ক্ষতি ডেকে আনতে পারে বলে সে বারবার বুঝানোর চেষ্টা করেছে, যতটা সম্ভব সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে ত্রাণ বিতরণ শেষ করতে। কিন্তু কে শোনে কার কথা। তাঁর বাবার সেই এক কথা, 'দুনিয়াতে তুই আগে আসছোস না আমি আগে আসছি?' বাকবিতণ্ডায় যাওয়ার সাহস নেই শফিকের। হটলাইনে সে ফোন দিয়েছে। ডাক্তারদের জানিয়েছে সে বিস্তারিত।

দুই ঘণ্টার মধ্যেই মেডিকেল টিম এসে হাজির। স্যাম্পল কালেকশন করে চলে গেছে তারা। পরীক্ষা করবে। রেজাল্ট জানাবে সন্ধ্যায়। রেজাল্ট জানালো সন্ধ্যার আরও পর এশার আগ মুহূর্তে। রেজাল্ট করোনা পজিটিভ। মানে ভাইরাস ধরা পড়েছে শমশের চেয়ারম্যানের শরীরে। তার দেড় ঘণ্টার মধ্যেই একটা অ্যাম্বুলেন্স এসে হাজির নার্সসহ। শমশের চেয়ারম্যানকে অ্যাম্বুলেন্সে করে নিয়ে গেল সরকারি মেডিকেলে। সাথে কাউকে যেতে দিল না। ডাক্তারের নিষেধ আছে। বড় ছেলে অনেক জোরাজুরি করেছে সাথে যাওয়ার জন্য, কিন্তু শেষ পর্যন্ত যেতে পারেনি কেউই।

২.
লতিফ আরতদারের কাছে শমশের চেয়ারম্যানের অসুস্থতার খবর গেল পরের দিন দুপুরে। এ খবর সে পেয়েছে চায়ের দোকানে। মানুষজনের মুখে মুখে রটে গেছে তাঁর অসুস্থতার খবর। এ খবর শুনে তাঁর দলীয় লোকজনই বেশি কষ্ট পেয়েছে। কারণ তাদের প্রত্যেককে তিনজনের ত্রাণ দেওয়ার আশ্বাস দেন শমশের চেয়ারম্যান। কিন্তু তারা সেই ত্রাণ এখনো পায়নি। শমশের চেয়ারম্যানের অসুস্থতায় একজন মানুষ শুধুমাত্র খুশি হয়েছেন, তিনি লতিফ আরতদার। এ খুশি অন্তরে রেখে দিলেন, বাইরে প্রকাশ করলেন না। দ্রুত আরতে চলে গেলেন তিনি। নাস্তা যা অর্ডার দিয়েছিলেন তা পুরোটা খাননি; অর্ধেকটা খেয়েই ছুটেছেন।

ত্রাণের চাল ছাড়া বাকি সব বিক্রি করে দিলেন কম দামে। চাল বিক্রি করলেন পরের দিন সন্ধ্যায়। চারদিকে খাদ্য সংকটের নানান কথা বুঝিয়ে চালের দাম ধরেছেন বাজারমূল্যের দ্বিগুণ। ট্রাক আসলো মাগরিবের পর।

শমশের চেয়ারম্যানের আর কোনো খবর পাচ্ছে না দলীয় লোকজন। তিনি কি সুস্থ হচ্ছেন না দিন দিন অবস্থার অবনতি হচ্ছে? খবর না পাওয়াতে তারা অস্থির হয়ে উঠলো। তাদের ত্রাণ আদৌ পাবে কি না তা নিয়ে চরম সন্দেহ তৈরি হয়েছে তাদের মধ্যে। এর মধ্যে দুই-একবার কথা বলার চেষ্টা করেছে শমশের চেয়ারম্যানের বড় ছেলে শফিকের সাথে। এতে কোনো খবর পেল বলে মনে হলো না। দলীয় লোকজন কাউকে বলতেও পারছে না যে তারা ত্রাণ পায়নি।

ত্রাণ না পাওয়া দলীয় লোকজন একসাথে বসেছে, কী করা যায় ত্রাণের বিষয়ে। একজন পরামর্শ দিল, যাদেরকে ত্রাণ দেওয়া হলো তাদের কাছ থেকে ত্রাণ ফিরিয়ে নিতে হবে। এইটা সবাই পছন্দ করল না। শেষমেশ সিদ্ধান্ত হলো তারা শমশের চেয়ারম্যানের বাড়িতে ডাকাতি করবে। ডাকাতি হলো তৃতীয় দিন রাতে। ডাকাতি করে কাজের কাজ তেমন কিছু হলো না। ত্রাণের কিছু পাওয়া যায়নি। ধানের গোলায় যা ধান ছিল তা নিয়ে এসেছে। ঘরের স্বর্ণ অলংকারের কথা মাথায় আসলো ঠিকই, কিন্তু চেয়ারম্যানের সম্মানের দিকে তাকিয়ে তাঁর পরিবারের কারোর উপর হাত তোলা হয়নি। চোখে পড়ার মতো কোনো ক্ষয়ক্ষতি তারা করেনি। ডাকাতির মূল উদ্দেশ্য ছিল ত্রাণ লুট, কিন্তু তা পায়নি।

এই ডাকাতির খবর শমশের চেয়ারম্যানের কানে যাওয়ার আগেই গেল লতিফ আরতদারের কাছে। সতর্কতার মাইর নাই। লতিফ আরতদার আরতের দরজা বন্ধ করে কাজকর্ম চালায়। কাজ করে আরতের লোকজন। তিনি আরতে আসা বন্ধ করে দিয়েছেন। ফোনে খোঁজখবর নেন।

শমশের চেয়ারম্যানের কাছে খবর পৌঁছার সাথে সাথে তিনি হার্ট অ্যাটাক করলেন। তাঁকে আইসিইউ-তে নেওয়া হয়েছে। চারদিন পর মেডিকেল থেকে ফোন এলো। রিসিভ করল বড় ছেলে শফিক। ওপাশ থেকে বলল, ‘শমশের চৌধুরী আপনার কে হন?’
শফিক বলল, ‘আমার বাবা হন। কেন কোনো খবর আছে?’
ওপাশ থেকে বলল, ‘আপনার বাবা একটু আগে ইন্তেকাল করেছেন।’

শফিক হাউমাউ করে বাচ্চার মতো কেঁদে উঠল। তারপর ওপাশ থেকে আবার বলল, ‘আমরা লাশ নিয়ে আসছি, কবর খুঁড়ে রাখুন। আমরাই কবরস্থ করব। আপনাদের পক্ষ থেকে শুধু একজন পুরুষ আসতে পারবে আমাদের সাথে।’ শফিক পরের কথাগুলো বুঝল না। সে অবচেতনের মতো মাটিতে বসে গঙানির মতো শব্দ করে কাঁদছে।

মন্তব্য (0)
আপনার মন্তব্য লিখুন
* চিহ্নিত তথ্য আবশ্যক। অশালীন মন্তব্য মুছে দেওয়া হবে।