ব্রেকিং
আনোয়ারায় বাবা-মাকে নৃশংসভাবে কুপিয়ে খুন করল ছেলে! আনোয়ারা উপকূলে ধ্বসে পড়ছে বেড়িবাঁধ, দ্রুত টেকসই সংস্কারের দাবি কর্ণফুলীতে আয়ুব বিবি ট্রাস্টের বৃক্ষ বিতরণ, সাড়ে ১৭ শত চারা হস্তান্তর অবশেষে পদত্যাগ করলেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন চট্টগ্রাম বোর্ডের স্থগিত এইচএসসি পরীক্ষা শুরু ২৭ জুলাই আনোয়ারায় সড়ক, কৃষি ও মৎস্য খাতে ক্ষতি প্রায় ৫০ কোটি টাকা হাইলধরে তীব্র নদীভাঙন, বারখাইনে প্রকাশ্যে স্কেভেটর দিয়ে বালু লুট; বেপরোয়া বালু সিন্ডিকেট! বরুমচড়ায় বন্যায় নিহত শিশুর পরিবারের পাশে জামায়াত আমীর ডাঃ শফিকুর রহমান আনোয়ারায় বালু সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্যঃ ভাঙছে নদীর পাড়, ঝুঁকিতে হাজারো মানুষের ঘর-বাড়ী বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত ঘর-বাড়ী সংস্কার ও মাছচাষীদের পাশে দাঁড়ানোর আহবান আনোয়ারা উপজেলা জামায়াতের আনোয়ারায় বাবা-মাকে নৃশংসভাবে কুপিয়ে খুন করল ছেলে! আনোয়ারা উপকূলে ধ্বসে পড়ছে বেড়িবাঁধ, দ্রুত টেকসই সংস্কারের দাবি কর্ণফুলীতে আয়ুব বিবি ট্রাস্টের বৃক্ষ বিতরণ, সাড়ে ১৭ শত চারা হস্তান্তর অবশেষে পদত্যাগ করলেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন চট্টগ্রাম বোর্ডের স্থগিত এইচএসসি পরীক্ষা শুরু ২৭ জুলাই আনোয়ারায় সড়ক, কৃষি ও মৎস্য খাতে ক্ষতি প্রায় ৫০ কোটি টাকা হাইলধরে তীব্র নদীভাঙন, বারখাইনে প্রকাশ্যে স্কেভেটর দিয়ে বালু লুট; বেপরোয়া বালু সিন্ডিকেট! বরুমচড়ায় বন্যায় নিহত শিশুর পরিবারের পাশে জামায়াত আমীর ডাঃ শফিকুর রহমান আনোয়ারায় বালু সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্যঃ ভাঙছে নদীর পাড়, ঝুঁকিতে হাজারো মানুষের ঘর-বাড়ী বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত ঘর-বাড়ী সংস্কার ও মাছচাষীদের পাশে দাঁড়ানোর আহবান আনোয়ারা উপজেলা জামায়াতের
সাহিত্য

শ্রাবণের অন্দরমহল

তানসীর আলম ২৪ জুলাই ২০২৬ রাত ৯:৫৮ সময়

বর্ষা হোক শান্ত-সুন্দর, তা যেন প্রলয়ের রূপ ধারণ না করে, এইটুকুই তো চাওয়া।

শ্রাবণের অন্দরমহল

শ্রাবণের অন্দরমহল | ফটো: প্রিয় আনোয়ারা

তানসীর আলম

শ্রাবণ শব্দটার মধ্যেই কেমন যেন একটা মখমলে আর্দ্রতা লেগে থাকে। আষাঢ়ের মতো তার কোনো জাঁকজমক নেই, মেঘের ডাকের মধ্যে কোনো তারস্বরে চিৎকার নেই; সে আসে নিঃশব্দে, পায়ে পায়ে, ঠিক যেন কোনো পুরনো অভিমানী প্রেমিকের মতো। জানালার ভারী পর্দাটা সরিয়ে যখন বাইরে তাকাই, দেখি একটানা ঝিরঝিরে বৃষ্টিতে চরাচর কেমন আবছা হয়ে গেছে। এই যে চারপাশের ধূসরতা, একটা হালকা কুয়াশার মতো চাদরএটাই তো শ্রাবণের ম্যাজিক। মনকে কেমন যেন অন্তর্মুখী করে তোলে। মনে হয়, বাইরের জগৎটা থাক না তার নিজের মতো, আমরা বরং নিজেদের ভেতরের বারান্দাটায় একটু বসি। শ্রাবণের এই জলভেজা রূপ আমাকে এক অদ্ভুত মোহে জড়ায়। এ যেন কোনো ফেলে আসা দুপুরের চিঠি, যা পড়তে পড়তে চোখের কোণটা অজান্তেই ভিজে ওঠে।

ঋতুচক্রের হিসেবে শ্রাবণ তো বর্ষার দ্বিতীয় মাস। কিন্তু সাহিত্যের অন্দরমহলে তার খাতির যেন আষাঢ়ের চেয়ে কোনো অংশে কম নয়, বরং কিছুটা বেশিই গূঢ়। আষাঢ় যদি হয় প্রথম মিলনের তীব্র আলোড়ন, তবে শ্রাবণ হলো সেই সম্পর্কের গভীরে প্রবেশ করা, যেখানে একটা থিতু হওয়া প্রেম আছে, আর আছে প্রচ্ছন্ন এক বিরহ। বৈষ্ণব পদাবলীর কবিরা যখন লেখেন, ‘এ ঘোর রজনী মেঘের ঘটা, কেমনে আইলো বাটে’—তখন বুঝতে অসুবিধা হয় না যে এই মেঘ আসলে বাইরের আকাশের নয়, মনের ভেতরের আঁধার। রবীন্দ্রনাথের গানেও শ্রাবণ এসেছে এক পরমাত্মীয়ের মতো। তাঁর বাদল দিনের প্রথম কদম ফুল, শ্রাবণ-বরিষন-মাঝে -এই গানগুলোর দিকে তাকালে বোঝা যায়, এই মাসটি কীভাবে মানুষের একাকীত্ব আর পরম প্রাপ্তির আকাঙ্ক্ষাকে মিলিয়ে দিয়েছে।

রবীন্দ্রনাথের গানে শ্রাবণ যেমন এক পরমাত্মীয়ের মতো আসে, আমাদের নজরুলের গানে তা রূপ নেয় এক তীব্র, বাঁধনহারা এবং অসম্ভব সংবেদনশীল আবেগে। নজরুলের গানে শ্রাবণের প্রবেশ রবীন্দ্র-ভাবালুতার চেয়ে অনেকটাই আলাদা। সেখানে যেমন আছে বিরহের প্রলয়ংকারী হাহাকার, তেমনই আছে প্রেমের এক উদগ্র ও ব্যাকুল বহিঃপ্রকাশ।

তাঁর ‘শাওন-রাতে যদি স্মরণে আসে মোরে গানটির কথাই ধরা যাক। শ্রাবণের সেই অবিরাম বর্ষণকে নজরুল বদলে দিয়েছেন প্রেমিকের চোখের জলে। ঝরে পড়া প্রতিটা বৃষ্টির ফোঁটা সেখানে হয়ে উঠেছে বিরহের এক একটা তপ্ত দীর্ঘশ্বাস। নজরুলের কাছে শ্রাবণ মানে ‘শাওন-গগনে ঘোর ঘনঘটার মতো এক অশান্ত মানসিক অবস্থা, যা বুকের ভেতর এক চরম হাহাকার আর না-পাওয়ার বেদনাকে দ্বিগুণ বাড়িয়ে দেয়। তিনি যখন লেখেন, ‘মেঘের ডমরু বাজে ওগো শাওন-জ্যোতি, তখন প্রকৃতির সেই রুদ্র রূপের মাঝেও এক পরম প্রিয়কে পাওয়ার আকুলতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

রবীন্দ্রনাথের শ্রাবণ যদি মানুষকে ভেতরের বারান্দায় টেনে এনে শান্ত সমাহিত এক আধ্যাত্মিক অনুভূতির মুখোমুখি দাঁড় করায়, তবে নজরুলের শ্রাবণ সেই মেঘলা আকাশকে সাক্ষী রেখে মানুষের ভেতরের সমস্ত অবদমিত প্রেম আর বিদ্রোহকে একাকার করে দেয়। আষাঢ়ের মেঘ যদি চোখকে টানে, তবে রবীন্দ্র-নজরুলের যুগলবন্দীতে শ্রাবণের বৃষ্টি টানে মন ও মননের গভীরতম সত্ত্বাকে। সাহিত্যে এবং বিশেষ করে বাংলা গানে তাই শ্রাবণ কেবল একটা কালখণ্ড নয়; রবীন্দ্রে যা গভীর মনস্তাত্ত্বিক রূপক, নজরুল-গীতিকায় তা-ই আবার তীব্র, জীবন্ত ও রক্তমাংসের এক পরম আর্তি।

এই মেঘ-বৃষ্টির আবহেই যদি একটু আন্তর্জাতিক জানলাটা খুলি, তবে বিশ্বসাহিত্যের বর্ষা আর আমাদের বাংলা সাহিত্যের বর্ষার ফারাকটা খুব স্পষ্ট হয়ে ওঠে। পাশ্চাত্যের সাহিত্যে বৃষ্টি মানেই এক ধরণের ক্লান্তি, মনখারাপ, কিংবা কোনো ক্রাইম থ্রিলারের গম্ভীর ব্যাকগ্রাউন্ড।

টি. এস. এলিয়টের সেই বিখ্যাত লাইন, ‘April is the cruelest month’। এই লাইনে বসন্ত বা বৃষ্টির ছোঁয়া এক ধরনের বিষণ্ণতার জন্ম দেয়। ভার্জিনিয়া উলফ বা জেমস জয়েসের লেখাতেও বৃষ্টি এসেছে মানুষের বিচ্ছিন্নতাকে আরও প্রখর করতে।

কিন্তু আমাদের বাংলা সাহিত্যে বৃষ্টি মানেই এক ধরনের উৎসব, এক ধরনের মুক্তি। আমরা বৃষ্টির শব্দে গান বাঁধি, মেঘের রঙে শাড়ির আঁচল খুঁজি। বিশ্বসাহিত্য যেখানে বৃষ্টিকে দেখে একঘেয়েমি হিসেবে, আমরা সেখানে একে দেখি প্রাণের স্পন্দন হিসেবে। তাহলে কি আমরা ওদের চেয়ে এগিয়ে আছি? অহংকার করে নয়, তবে অনুভূতির সূক্ষ্মতায় আর ভালোবাসার গভীরতায় বাংলা সাহিত্য নিসন্দেহে এই জল-হাওয়ার উদযাপনে অনেক বেশি সংবেদনশীল, অনেক বেশি সমৃদ্ধ।

অনেকে ভাবেন, মেঘ কাটলে যেমন রোদ্দুর বেরোয়, তেমনি বৃষ্টির ছন্দে কেবল কবিতাই জন্ম নেয়। গল্পকার বা ঔপন্যাসিকদের বুঝি এই জলে পা ভেজাতে নেই। কিন্তু সত্যি কি তাই? বর্ষার এই একটানা একাকীত্ব কি কথাসাহিত্যিকদের প্ররোচিত করেনি? অবশ্যই করেছে।

 

একটু মনে করে দেখুন বিভূতিভূষণের ‘পথের পাঁচালীর সেই অমোঘ দৃশ্যটি। অপু আর দুর্গার সেই বৃষ্টিতে ভেজার দৃশ্যটি কি কেবলই প্রকৃতির বর্ণনা? তা তো আসলে গ্রামীণ কৈশোরের এক আদিম আনন্দের কোলাজ, যা পরে দুর্গার অকালমৃত্যুর এক করুণ পূর্বাভাস হয়ে দাঁড়ায়।

কিংবা তারাশঙ্করের ‘কবি উপন্যাসের সেই নিতাই আর বসন্তের জীবনের পটভূমি, সেখানেও তো বর্ষা এক অচ্ছেদ্য অঙ্গ।

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘পদ্মা নদীর মাঝি উপন্যাসে ইলিশ ধরার মরশুম আর বর্ষার জল কীভাবে কুবেরদের জীবনের নিয়তি নির্ধারণ করে, তা ভাবলে গায়ে কাঁটা দেয়।

আর আমাদের হুমায়ূন আহমেদ? তাঁর উপন্যাসের নায়িকারা তো বৃষ্টি না এলে কাঁদতেই পারত না। বর্ষা সেখানে সংলাপের মতো কাজ করেছে, চরিত্রের ভেতরের জট ছেড়েছে। সুতরাং, কবিদের মতোই গল্পকারদের কলমকেও এই বর্ষা সমানভাবে চঞ্চল করেছে।

আমার নিজের জীবনের দিকে তাকালে, মফস্বলের বর্ষা আর গ্রামীণ বর্ষার একটা টানাপোড়েন স্পষ্ট দেখতে পাই। মফস্বলের বর্ষার একটা নাগরিক নস্টালজিয়া আছে। ছাতা মাথায় দিয়ে গলির মোড়ের চায়ের দোকানে আড্ডা, জানালার কাচে জলের ফোঁটার আলপনা, আর লোডশেডিংয়ের অন্ধকারে মোমবাতির আলোয় পুরনো কোনো সিনেমার গান শোনা।

কিন্তু এই সমস্ত মোহ একপাশে সরিয়ে রাখলে, আমার পরম প্রিয় আসলে গ্রামের বর্ষা। গ্রামে বর্ষা আসে তার সমস্ত আদিমতা আর অবারিত রূপ নিয়ে। মাইলের পর মাইল বিস্তৃত সবুজ ক্ষেত যখন জলের তলায় চলে যায়, যখন পুকুরের ঘাট উপচে জল এসে গৃহস্থের উঠোন ছোঁয়, তখন মনে হয় প্রকৃতি যেন তার নিজের নিয়মেই সব সীমানা মুছে দিচ্ছে।

গ্রামের সেই ভেজা মাটির সোঁদা গন্ধ, কদম ফুলের রেণু মেশানো বাতাস, আর দূরের বিলের বুকে একলা চরে বেড়ানো নৌকো; এই দৃশ্যের কোনো বিকল্প হয় না। মফস্বলের বর্ষায় একটা কৃত্রিম আবরণ থাকে, কিন্তু গ্রামের বর্ষা একেবারে অকৃত্রিম, নগ্ন সুন্দর।

তবে এই সুন্দরের আড়ালে যে একটা চরম কুৎসিত, আগ্রাসী রূপও লুকিয়ে আছে, তা অস্বীকার করি কী করে? আর এই আলাপ রাখতে গেলেই বুকটা বিষাদে বড় ভারী হয়ে ওঠে। যে শ্রাবণকে নিয়ে এতক্ষণ মুগ্ধতার জাল বুনলাম, তার এই রুদ্র, প্রলয়ংকরী রূপটার প্রতি এক ধরণের তীব্র উষ্মা আর ক্ষোভ জন্মায় মনে।

প্রতি বছর যখন মিডিয়ার বরাতে জানতে পারি, টানা বর্ষণে বান ডেকেছে, নদীর বাঁধ ভেঙে গেছে, আর মাইলের পর মাইল মানুষ ভিটেমাটি হারিয়ে স্রেফ এক কাপড়ে রাস্তায় এসে দাঁড়িয়েছে; তখন এই সমস্ত রোমান্টিকতা এক লহমায় ফিকে হয়ে যায়।

বর্ষার এই আগ্রাসী রূপ কত মানুষকে রাতারাতি উদ্বাস্তুতে পরিণত করে, কত শিশুর মুখের গ্রাস কেড়ে নেয়, তা দেখার পর আর মেঘের দিকে তাকিয়ে কবিতা লেখা যায় না। এই নিষ্ঠুর দৃশ্য আমি আর দেখতে চাই না।

প্রকৃতির এই মারমুখী আচরণের সামনে দাঁড়িয়ে মানুষ যেন তার ভেতরের মনুষ্যত্বটুকু না হারায়। আমরা যেন একে অপরের বিপদে, এই চরম দুর্দিনে হাত বাড়িয়ে দিই।

কোনো ত্রাণের দাক্ষিণ্য নয়, বরং সহমর্মিতার খাতিরেই মানুষের পাশে মানুষের দাঁড়ানো উচিত।

রাষ্ট্রকে এবার একটু স্থির হতে হবে। প্রতি বছরের এই চেনা ট্র্যাজেডি, এই একই কান্নার পুনরাবৃত্তি আর কতকাল চলবে? বিজ্ঞানসম্মত বাঁধ নির্মাণ এবং সঠিক দূরদর্শিতার মাধ্যমে রাষ্ট্রকে এমন এক সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে হবে, যাতে এই বানের জল আর কোনো মানুষের চোখের জল না হয়ে ওঠে।

শ্রাবণ আসুক, তার স্নিগ্ধতা নিয়ে আমাদের মনকে ভিজিয়ে দিক। কিন্তু তার সেই রূপ যেন কোনো মায়ের কোল খালি না করে, কোনো মানুষের মাথার ওপর থেকে ছাদটুকু কেড়ে না নেয়।

বর্ষা হোক শান্ত-সুন্দর, তা যেন প্রলয়ের রূপ ধারণ না করে, এইটুকুই তো চাওয়া।

তানসীর আলম
গল্পকার, অনুবাদক
চট্টগ্রাম।
যোগাযোগঃ ০১৮৩৫৮২৫৪৭৪ 

 

ট্যাগ: #শ্রাবণ #বর্ষা
মন্তব্য (0)
আপনার মন্তব্য লিখুন
* চিহ্নিত তথ্য আবশ্যক। অশালীন মন্তব্য মুছে দেওয়া হবে।