ব্রেকিং
চট্টগ্রামের প্রগতিশীল রাজনীতির বাতিঘর ব্যারিস্টার বজলুস সাত্তারঃ জীবন, কর্ম ও পূর্ব বাংলার স্বাধিকার আন্দোলনে ঐতিহাসিক ভূমিকা গৃহহীন ৩০০ পরিবারকে পাকা ঘর দেবে আস-সুন্নাহ ফাউন্ডেশন আনোয়ারা বাঁশখালীর বন্যাকবলিত মানুষের পাশে সেনাবাহিনী আনোয়ারায় সহস্রাধিক দুর্গত পরিবারের মাঝে জামায়াতের ফুডপ্যাক বিতরণ ওঝার কাছে যাওয়ার আগে সিভিল সার্জনের কড়া হুঁশিয়ারি! আনোয়ারাসহ চট্টগ্রামে সাপের কামড়ে রেকর্ড আক্রান্ত তালাকের পরও মেটেনি ক্ষোভ! সাবেক স্ত্রীর গোপন ভিডিও ছড়ানো কে এই নাঈম? উপজেলা সাংবাদিকতার সংকটঃ প্রভাব ও নীরবতার রাজনীতি আনোয়ারাসহ চট্টগ্রামে বন্যা ও পাহাড়ধসে ১৩ জনের মৃত্যু, ক্ষতিগ্রস্ত ৬ লাখ মানুষ আনোয়ারায় বন্যাদুর্গতদের পাশে বিরোধীদলীয় চিপ হুইপ নাহিদ ইসলাম কোলে ৮ মাসের শিশু, শরীরে জড়ানো ২৪ হাজার ইয়াবা! মহাসড়কে যেভাবে ধরা পড়ল এই দম্পতি চট্টগ্রামের প্রগতিশীল রাজনীতির বাতিঘর ব্যারিস্টার বজলুস সাত্তারঃ জীবন, কর্ম ও পূর্ব বাংলার স্বাধিকার আন্দোলনে ঐতিহাসিক ভূমিকা গৃহহীন ৩০০ পরিবারকে পাকা ঘর দেবে আস-সুন্নাহ ফাউন্ডেশন আনোয়ারা বাঁশখালীর বন্যাকবলিত মানুষের পাশে সেনাবাহিনী আনোয়ারায় সহস্রাধিক দুর্গত পরিবারের মাঝে জামায়াতের ফুডপ্যাক বিতরণ ওঝার কাছে যাওয়ার আগে সিভিল সার্জনের কড়া হুঁশিয়ারি! আনোয়ারাসহ চট্টগ্রামে সাপের কামড়ে রেকর্ড আক্রান্ত তালাকের পরও মেটেনি ক্ষোভ! সাবেক স্ত্রীর গোপন ভিডিও ছড়ানো কে এই নাঈম? উপজেলা সাংবাদিকতার সংকটঃ প্রভাব ও নীরবতার রাজনীতি আনোয়ারাসহ চট্টগ্রামে বন্যা ও পাহাড়ধসে ১৩ জনের মৃত্যু, ক্ষতিগ্রস্ত ৬ লাখ মানুষ আনোয়ারায় বন্যাদুর্গতদের পাশে বিরোধীদলীয় চিপ হুইপ নাহিদ ইসলাম কোলে ৮ মাসের শিশু, শরীরে জড়ানো ২৪ হাজার ইয়াবা! মহাসড়কে যেভাবে ধরা পড়ল এই দম্পতি
মতামত ব্রেকিং

চট্টগ্রামের প্রগতিশীল রাজনীতির বাতিঘর ব্যারিস্টার বজলুস সাত্তারঃ জীবন, কর্ম ও পূর্ব বাংলার স্বাধিকার আন্দোলনে ঐতিহাসিক ভূমিকা

সাইফুল ইসলাম সাইফ ১৩ জুলাই ২০২৬ রাত ৯:২৬ সময়

তিনি ছিলেন মজলুম জননেতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর অত্যন্ত বিশ্বস্ত রাজনৈতিক সহচর, ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির (ন্যাপ) প্রথম সারির নীতিনির্ধারক এবং চট্টগ্রামের প্রগতিশীল বুদ্ধিবৃত্তিক মহলের এক অবিসংবাদিত অভিভাবক।

চট্টগ্রামের প্রগতিশীল রাজনীতির বাতিঘর ব্যারিস্টার বজলুস সাত্তারঃ জীবন, কর্ম ও পূর্ব বাংলার স্বাধিকার আন্দোলনে ঐতিহাসিক ভূমিকা

ব্যারিস্টার বজলুস সাত্তার | ফটো: প্রিয় আনোয়ারা

বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে পূর্ব বাংলার স্বাধিকার আন্দোলন, প্রগতিশীল রাজনীতি এবং সমাজতান্ত্রিক ভাবধারার বিকাশে যে সকল নিভৃতচারী অথচ অত্যন্ত প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব নেতৃত্ব দিয়েছিলেন, ব্যারিস্টার বজলুস সাত্তার তাঁদের মধ্যে অন্যতম। তিনি ছিলেন মজলুম জননেতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর অত্যন্ত বিশ্বস্ত রাজনৈতিক সহচর, ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির (ন্যাপ) প্রথম সারির নীতিনির্ধারক এবং চট্টগ্রামের প্রগতিশীল বুদ্ধিবৃত্তিক মহলের এক অবিসংবাদিত অভিভাবক।

প্রায় ৯৭ বছরের এক দীর্ঘ ও বর্ণিল জীবনে তিনি ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমল, পাকিস্তানি দমনপীড়ন বিরোধী আন্দোলন এবং স্বাধীন বাংলাদেশের রাজনৈতিক বিবর্তনের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পর্বগুলো প্রত্যক্ষ করেছেন এবং তাতে সক্রিয় ভূমিকা রেখেছেন। পেশাগত জীবনে একজন আইনজ্ঞ হওয়া সত্ত্বেও তাঁর ধ্যান-জ্ঞান উৎসর্গীকৃত ছিল শোষিত ও বঞ্চিত মানুষের অধিকার আদায়ের সংগ্রামে।

পারিবারিক ঐতিহ্য ও সামাজিক পটভূমি

ব্যারিস্টার বজলুস সাত্তারের জন্ম ও বেড়ে ওঠার পেছনে রয়েছে চট্টগ্রামের এক সুদীর্ঘ ও গৌরবোজ্জ্বল পারিবারিক ও সামাজিক পটভূমি। তিনি ছিলেন চট্টগ্রামের তৎকালীন মিউনিসিপ্যালিটির (পৌরসভা) প্রথম নির্বাচিত বাঙালি ও বেসরকারি চেয়ারম্যান খান বাহাদুর আবদুস সাত্তারের জ্যেষ্ঠ পুত্র। উল্লেখ্য, ১৮৬৪ সালে ডিস্ট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেট জে ডি ওয়ার্ডের মাধ্যমে যাত্রা শুরু করা চট্টগ্রাম মিউনিসিপ্যালিটিতে দীর্ঘকাল যাবত ইংরেজরাই প্রশাসকের দায়িত্ব পালন করতেন। ১৯১৬ সালে প্রথম বাঙালি হিসেবে খান বাহাদুর আমান আলী মনোনীত চেয়ারম্যান নিযুক্ত হলেও, ১৯১৯ সালে প্রথম গণতান্ত্রিক উপায়ে নির্বাচিত চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্বভার গ্রহণ করেন খান বাহাদুর আবদুস সাত্তার। তিনি ব্রিটিশ ভারতে মুসলিম রেনেসাঁ আন্দোলনের অগ্রভাগে ছিলেন এবং ১৯২৬ সালে এ অঞ্চলে সমবায় আন্দোলনের বিকাশের লক্ষ্যে ঐতিহাসিক "চট্টগ্রাম জেলা সমবায় কৃষক সমিতি" প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৪৩ সালের ভয়াবহ মন্বন্তরের সময়েও তিনি কংগ্রেস নেতা ব্যারিস্টার এস. এল খাস্তগীরের সাথে যৌথভাবে সর্বদলীয় ত্রাণ কমিটি গঠন করে চট্টগ্রামের হাজার হাজার দুর্ভিক্ষপীড়িত মানুষের প্রাণ বাঁচিয়েছিলেন। পিতার এই মানবতাবাদী ও গণমুখী রাজনৈতিক দর্শন বজলুস সাত্তারকে আজীবন অনুপ্রাণিত করেছিল।

পারিবারিক বন্ধনের দিক থেকেও বজলুস সাত্তার তৎকালীন বাংলার শীর্ষস্থানীয় জাতীয়তাবাদী নেতৃত্বের সাথে যুক্ত ছিলেন। তিনি ছিলেন ব্রিটিশ ভারতের অবিভক্ত বাংলার মন্ত্রী, প্রখ্যাত কৃষক প্রজা আন্দোলনের অন্যতম শীর্ষ নেতা এবং স্বাধীন পাকিস্তানের পক্ষে বার্মায় নিযুক্ত প্রথম রাষ্ট্রদূত মৌলভী শামসুদ্দিন আহমেদের জামাতা। শামসুদ্দিন আহমেদ হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর মন্ত্রিসভার সদস্য এবং শেরে বাংলা এ. কে. ফজলুল হকের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ সহচর ছিলেন। ১৯৬৯ সালের ৩১ অক্টোবর এই মহান প্রবীণ রাজনীতিবিদ চট্টগ্রামে তাঁর জামাতা বজলুস সাত্তারের জামাল খান লেনের ঐতিহাসিক বাসভবন "সাত্তার মঞ্জিল"-এ অবস্থানকালেই শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। সাত্তার মঞ্জিল কেবল একটি পারিবারিক বাসস্থান ছিল না, বরং তা ছিল জাতীয় রাজনীতির নীতিনির্ধারকদের এক মিলনমেলা।

পূর্ব বাংলার স্বাধিকার আন্দোলনে রাজনৈতিক তৎপরতা

ব্যারিস্টার বজলুস সাত্তারের রাজনৈতিক সক্রিয়তা শুরু হয় দেশভাগের অব্যবহিত পর থেকেই। তিনি পূর্ব বাংলার জনগণের ওপর পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর চাপিয়ে দেওয়া অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলেন।

১৯৪৯ সালের ২৬ আগস্ট চট্টগ্রামের লালদীঘি ময়দানে আওয়ামী মুসলিম লীগের উদ্যোগে এক বিশাল জনসভা অনুষ্ঠিত হয়। মওলানা ভাসানীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই ঐতিহাসিক সভায় তৎকালীন তরুণ ছাত্রনেতা শেখ মুজিবুর রহমান পূর্ব বাংলার বিরাজমান খাদ্য ও বস্ত্র সংকটের তীব্র সমালোচনা করে বক্তব্য পেশ করেন। এই সভায় চট্টগ্রামের স্থানীয় প্রগতিশীল নেতৃত্বকে সংগঠিত করার ক্ষেত্রে বজলুস সাত্তার এবং জহুর আহমদ চৌধুরী অত্যন্ত সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন এবং সমাবেশে গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য রাখেন। এই প্রারম্ভিক সক্রিয়তাই পরবর্তীকালে তাঁকে চট্টগ্রামের বাম-প্রগতিশীল ও জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের অন্যতম প্রধান নীতি-নির্ধারকে পরিণত করে।

১৯৭১ সালের জানুয়ারি মাসের ঐতিহাসিক মহাসমাবেশ

১৯৭০ সালের ঐতিহাসিক সাধারণ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের বিপুল বিজয়ের পর যখন পাকিস্তানি সামরিক জান্তা ক্ষমতা হস্তান্তরে অস্বীকৃতি জানায়, তখন পূর্ব বাংলার স্বাধিকার আন্দোলন এক চূড়ান্ত রূপ পরিগ্রহ করে। ১৯৭১ সালের জানুয়ারি মাসে চট্টগ্রামের লালদীঘি ময়দানে ব্যারিস্টার বজলুস সাত্তারের সভাপতিত্বে এক বিশাল ও ঐতিহাসিক জনসভা অনুষ্ঠিত হয়। সেই জনসভায় প্রধান অতিথির ভাষণে মওলানা ভাসানী দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে ঘোষণা করেছিলেন যে, পূর্ব বাংলার জনগণ অবশ্যই একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করবে এবং এ জন্য যে কোনো চরম ত্যাগ স্বীকারে বাঙালিরা প্রস্তুত। বজলুস সাত্তারের সুদক্ষ সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই মহাসমাবেশটি চট্টগ্রাম অঞ্চলে অসহযোগ আন্দোলন এবং সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের ক্ষেত্র প্রস্তুতকরণে এক যুগান্তকারী ভূমিকা পালন করেছিল।

১৯৭১ সালের ২২ মার্চের ঐতিহাসিক ফোনালাপ

১৯৭১ সালের উত্তাল মার্চ মাসে অসহযোগ আন্দোলন যখন তুঙ্গে, তখন মওলানা ভাসানী চট্টগ্রাম সফরকালে র রহমতগঞ্জের "সাত্তার মঞ্জিল"-এ ব্যারিস্টার বজলুস সাত্তারের আতিথ্য গ্রহণ করেন। ২২ মার্চ ১৯৭১ তারিখে এই সাত্তার মঞ্জিল থেকেই মওলানা ভাসানী ঢাকার ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে অবস্থানরত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সাথে টেলিফোনে এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সংলাপে মিলিত হন। বাইরে তখন লক্ষাধিক মানুষের সমাবেশ ও স্লোগান চলছিল। এই ফোনালাপে উভয় নেতাই একমত হন যে, পশ্চিম পাকিস্তানি সামরিক জান্তার সাথে আর কোনো আপস বা সমঝোতা নয়, বরং এখন পূর্ণ স্বাধীনতার লক্ষ্যেই এগিয়ে যেতে হবে। এই ঐতিহাসিক ঘটনার প্রত্যক্ষ সাক্ষী ও মধ্যস্থতাকারী হিসেবে বজলুস সাত্তার মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে এক অনন্য মর্যাদার অধিকারী।

স্বাধীন বাংলাদেশে ন্যাপের রাজনীতি ও বজলুস সাত্তারের সাংগঠনিক নেতৃত্ব

দেশ স্বাধীন হওয়ার পর অসাম্প্রদায়িক, বৈষম্যহীন ও সমাজতান্ত্রিক বাংলাদেশ বিনির্মাণের লড়াইয়ে ব্যারিস্টার বজলুস সাত্তার নিজেকে নিয়োজিত রাখেন। ১৯৭২ সালের ফেব্রুয়ারিতে টাঙ্গাইলে অনুষ্ঠিত ন্যাপের ওয়ার্কিং কমিটির জরুরি বর্ধিত সভায় মওলানা ভাসানীকে দল পুনর্গঠনের পূর্ণ ক্ষমতা দেওয়া হয়। সেই সভায় সারা দেশে দলের সাংগঠনিক শক্তি বৃদ্ধির লক্ষ্যে একটি শক্তিশালী সাংগঠনিক কমিটি গঠিত হয়, যার অন্যতম প্রধান সাংগঠনিক সম্পাদক (ঙৎমধহরংরহম ঝবপৎবঃধৎু) হিসেবে ব্যারিস্টার বজলুস সাত্তারকে চট্টগ্রাম বিভাগের পূর্ণ দায়িত্ব দেওয়া হয়। অত্যন্ত প্রতিকূল রাজনৈতিক পরিস্থিতিতেও তিনি চট্টগ্রাম, পার্বত্য চট্টগ্রাম ও নোয়াখালী অঞ্চলে ন্যাপের সাংগঠনিক কাঠামোকে তৃণমূল পর্যায়ে বিস্তৃত করতে সমর্থ হন।

১৯৭৩ সালের অনশন ভঙ্গ ও সর্বদলীয় ঐক্য প্রচেষ্টা

১৯৭৩ সালের মে মাসে দেশের চরম খাদ্য সংকট, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি এবং নাগরিক অধিকার হরণের প্রতিবাদে মওলানা ভাসানী আমরণ অনশন শুরু করেন। প্রবীণ নেতার ক্রমাগত শারীরিক অবনতিতে দেশজুড়ে চরম উদ্বেগ সৃষ্টি হয়। এই ক্রান্তিকালে ব্যারিস্টার বজলুস সাত্তার, প্রখ্যাত রাজনীতিবিদ অলি আহাদ এবং কাজী জাফর আহমদ যৌথভাবে মওলানা ভাসানীর সাথে সাক্ষাৎ করেন এবং তাঁকে অনশন ভঙ্গের জন্য সনির্বন্ধ অনুরোধ জানান। তাঁদের মধ্যস্থতায় এবং কয়েকটি সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক শর্তে মওলানা ভাসানী অনশন ভঙ্গ করতে সম্মত হন। শর্তগুলো ছিল, ন্যাপের ২২ মে'র জনসভাকে সর্বদলীয় জনসভায় রূপান্তর করা এবং সেখানে সকল প্রগতিশীল নেতার বক্তব্য প্রদানের সুযোগ দেওয়া। ২৯ মে ১৯৭৩ থেকে দেশব্যাপী আইন-অমান্য আন্দোলনের সূচনা করা। শোষণের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ জাতীয় সংগ্রাম গড়ে তোলা। 

এই অনশন ভঙ্গের পর কর্মসূচি নির্ধারণের জন্য জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ) কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিদের যে বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়, তাতেও বজলুস সাত্তার ন্যাপের পক্ষে সক্রিয় ও অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন।

১৯৭৮ সালের দলীয় বিভাজন ও ন্যাপ (সাত্তার) গঠন

মওলানা ভাসানীর মৃত্যুর পর ১৯৭৬ সাল থেকে ন্যাপের অভ্যন্তরে চরম নেতৃত্ব সংকট এবং আদর্শিক উপদলীয় কোন্দল দেখা দেয়। কাজী জাফর আহমদ ও রাশেদ খান মেনন ইউপিপি গঠন করেন এবং হাজী দানেশ জাগমুই গঠন করে আলাদা হয়ে যান। এই পরিস্থিতিতে ভাসানীর মূল সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধী ও কৃষক-শ্রমিক রাজ প্রতিষ্ঠার আপসহীন রাজনৈতিক ধারাকে টিকিয়ে রাখার লক্ষ্যে ১৯৭৮ সালে আলহাজ্ব বজলুস সাত্তার ন্যাপের একটি বৃহৎ অংশকে সংগঠিত করে নিজস্ব ন্যাপ গঠন করেন, যা সমকালীন রাজনৈতিক মহলে "বজলুস সাত্তারের ন্যাপ" নামে পরিচিতি পায়। এটি ছিল তাঁর রাজনৈতিক দূরদর্শিতা ও ভাসানীর দর্শনের প্রতি অবিচল আস্থার এক অনন্য প্রমাণ।

সাংস্কৃতিক আভিজাত্য, সুফি দর্শন ও বুদ্ধিবৃত্তিক সংযোগ

ব্যারিস্টার বজলুস সাত্তার কেবল একজন শুষ্ক রাজনীতিবিদ ছিলেন না; তিনি ছিলেন উচ্চ শিক্ষিত, রুচিশীল এবং চট্টগ্রামের সাংস্কৃতিক ও সুফি দার্শনিক ঘরানার এক প্রধান পৃষ্ঠপোষক। হযরত শাহসুফী সৈয়দ আহমদুল হক (র.) কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত 'আল্লামা রুমী সোসাইটি বাংলাদেশ'-এর মাসিক আলোচনা সভা ও ছেমা মাহফিলগুলোতে তিনি নিয়মিত অংশগ্রহণ করতেন। চট্টগ্রামের বাঘঘোনাস্থ ঐতিহাসিক 'রূহ আফজা কুটিরে' আয়োজিত এই জ্ঞানতাত্ত্বিক আসরগুলোতে তাঁর নিয়মিত সহ-আলোচক ছিলেন, প্রখ্যাত পদার্থবিদ ও গণিতজ্ঞ ড. জামাল নজরুল ইসলাম, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন উপাচার্য ড. আর আই চৌধুরী, বরেণ্য ইতিহাসবিদ ড. আবদুল করিম, দৈনিক আজাদীর সম্পাদক অধ্যাপক মোহাম্মদ খালেদ ও পিএইচপি ফ্যামিলির প্রতিষ্ঠাতা সুফী মোহাম্মদ মিজানুর রহমান প্রমুখ। এই আসরগুলো ছিল সুফি দর্শন, বিজ্ঞান এবং মানবিক মূল্যবোধের এক চমৎকার সমন্বয়স্থল, যা চট্টগ্রামের সমাজ-সংস্কৃতিকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল।

প্রগতিশীল শিল্পচর্চার সাথে সংযুক্তি

পূর্ব পাকিস্তানের প্রগতিশীল লেখক, কবি ও শিল্পীদের সাথেও তাঁর নিবিড় যোগাযোগ ছিল। বাংলাদেশের প্রখ্যাত ভাস্কর নভেরা আহমেদের প্রগতিশীল শিল্পচর্চা এবং তাঁর জীবনকে কেন্দ্র করে রচিত সাহিত্য ও নাট্যকর্মে তৎকালীন চট্টগ্রামের সাংস্কৃতিক অভিভাবক হিসেবে ব্যারিস্টার বজলুস সাত্তার, মাহবুবুল আলম চৌধুরী (একুশের প্রথম কবিতার কবি), সৈয়দ মোহাম্মদ আলী এবং জয়নুল আবেদিনের নাম অত্যন্ত সম্মানের সাথে উচ্চারিত হয়েছে, যা তাঁর প্রগতিশীল ও অসাম্প্রদায়িক মননশীলতার পরিচয় বহন করে।

জীবন সায়াহ্ন ও ঐতিহাসিক মূল্যায়ন

২০০৬ সালের ৮ ডিসেম্বর চট্টগ্রাম শহরের জামাল খানস্থ তাঁর নিজস্ব ঐতিহাসিক বাসভবন সাত্তার মঞ্জিলে বার্ধক্যজনিত নানাবিধ জটিলতার কারণে ৯৭ বছর বয়সে এই বরেণ্য রাজনীতিক ও সমাজসেবক শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তাঁর মৃত্যুর পর চট্টগ্রামের জামাল খান ও রহমতগঞ্জ এলাকায় গভীর শোকের ছায়া নেমে আসে এবং সর্বস্তরের মানুষের অংশগ্রহণে সাত্তার মঞ্জিলে তাঁর কুলখানি ও জানাজা সম্পন্ন হয়। মৃত্যুর সময় তিনি তাঁর স্ত্রী, এক পুত্র, পাঁচ কন্যা এবং অসংখ্য গুণগ্রাহী ও রাজনৈতিক অনুসারী রেখে যান।

ব্যারিস্টার বজলুস সাত্তারের দীর্ঘ জীবন ও কর্ম বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, তিনি ছিলেন বাংলার এমন এক রাজনৈতিক প্রজন্মের প্রতিনিধি, যাঁরা ব্যক্তি স্বার্থ বা ক্ষমতার মোহে রাজনীতি করেননি। জমিদার ও আমলাতান্ত্রিক অভিজাত পরিবারে জন্ম নেওয়া সত্ত্বেও তিনি আমরণ সাধারণ কৃষক, শ্রমিক ও মেহনতি মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন।

চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী "খান বাহাদুর আবদুস সাত্তার রোড" এবং ঐতিহাসিক "সাত্তার মঞ্জিল" আজ কেবল ইটের দালান বা পিচঢালা পথ নয়, বরং তা ব্যারিস্টার বজলুস সাত্তারের মতো এক দেশপ্রেমিক, নির্লোভ ও প্রগতিশীল ব্যক্তিত্বের স্মৃতি বহনকারী ঐতিহাসিক স্মারক। স্বাধীন বাংলাদেশের রাজনৈতিক বিবর্তন এবং অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক ধারাকে অক্ষুণ্ণ রাখতে তাঁর জীবন ও আদর্শ তরুণ প্রজন্মের জন্য এক চিরন্তন অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে।

লেখকঃ সম্পাদক, প্রিয় আনোয়ারা

 

ট্যাগ: #আনোয়ারার কৃতি ব্যাক্তিত্ব #ব্যারিস্টার বজলুস সাত্তার #ন্যাপ #ভাষানী #সাইফুল ইসলাম সাইফ
মন্তব্য (0)
আপনার মন্তব্য লিখুন
* চিহ্নিত তথ্য আবশ্যক। অশালীন মন্তব্য মুছে দেওয়া হবে।