আনোয়ারার ‘লতিফ গ্রুপ’ ও একজন মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার আবদুল লতিফ চৌধুরী
অথচ ইতিহাসের পাতায় এই প্রচারবিমুখ বীর মুক্তিযোদ্ধার নাম হয়তো অনেকেরই অজানা। আনোয়ারার বারখাইন গ্রামে অবস্থিত মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল লতিফ চৌধুরীর বাড়িটিই ছিল একাত্তরের আনোয়ারা অঞ্চলের এক অজেয় মুক্তিসেনাদের দুর্গ।
বীর মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার আবদুল লতিফ চৌধুরী | ফটো: প্রিয় আনোয়ারা
একাত্তরের অগ্নিঝরা দিনগুলোতে মেশিনগান আর অদম্য দেশপ্রেম বুকে নিয়ে যিনি শত্রুশিবিরে কাঁপন ধরিয়েছিলেন, তিনি চট্টগ্রামের আনোয়ারার বারখাইন গ্রামের কৃতি সন্তান, বীর মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার আবদুল লতিফ চৌধুরী।
অথচ ইতিহাসের পাতায় এই প্রচারবিমুখ বীর মুক্তিযোদ্ধার নাম হয়তো অনেকেরই অজানা। আনোয়ারার বারখাইন গ্রামে অবস্থিত মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল লতিফ চৌধুরীর বাড়িটিই ছিল একাত্তরের আনোয়ারা অঞ্চলের এক অজেয় মুক্তিসেনাদের দুর্গ।
একাত্তরের উদ্ধারকৃত দলিল ও আনোয়ারার মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের পাতা উল্টালে উন্মোচিত হয় এক অসমসাহসী কমান্ডার আবদুল লতিফ চৌধুরীর গৌরবগাথা।
সৈনিক থেকে মুক্তিসেনাঃ 'লতিফ গ্রুপ'-এর জন্ম
১৯১৮ সালের ৪ অক্টোবর আনোয়ারার বারখাইন গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন আবদুল লতিফ চৌধুরী। পিতা মরহুম হাজী ঠাণ্ডা মিয়া এবং মাতা মরহমা মায়মুনা খাতুনের এই সন্তান ১৯৪৩ সালে কর্মজীবন শুরু করেন।
পরবর্তীতে তিনি ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টে (ইপিআর) নায়েক সুবেদার হিসেবে দীর্ঘ সামরিক অভিজ্ঞতা অর্জন করেন এবং ১৯৬৮ সালে অবসরে যান। অবসরে গেলেও তাঁর ভেতরের সৈনিক সত্ত্বা ফুরিয়ে যায়নি।
পাকিস্তানী বাহিনীর বিরুদ্ধে মুক্তিযুদ্ধের ডাক আসলে আনোয়ারার যুবসমাজকে সংগঠিত করতে নেমে পড়েন এই অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা।
২৬ মার্চ স্বাধীনতা ঘোষণার পর আবু, রস্তম, ফরহাদ, কাসেম, বক্কর, হাশেম, সবুরদের মতো স্থানীয় একঝাঁক টগবগে তরুণকে নিয়ে তিনি গড়ে তোলেন একটি সুসংগঠিত মুক্তিবাহিনী, যা যুদ্ধকালীন সময়ে ‘লতিফ গ্রুপ’ নামে পরিচিতি পায়।
আব্দুল মাবুদ চৌধুরীর বাড়িঃ আনোয়ারার ‘মুক্তিবাহিনী ক্যাম্প’
ঐতিহাসিক তথ্যসূত্র থেকে জানা যায়, আনোয়ারার বারখাইন গ্রামে অবস্থিত আব্দুল মাবুদ চৌধুরীর বাড়িটিই ছিল লতিফ গ্রুপের মূল ঘাঁটি। ভৌগোলিক অবস্থান ও লতিফ চৌধুরীর রণকৌশলের কারণে এই বাড়িটি ছিল অত্যন্ত দুর্ভেদ্য, যার ফলে স্থানীয় রাজাকার বা দালালেরা সেখানে শুরুতে হানা দেওয়ার সাহস পায়নি।
বাড়ির আঙিনাকে বানানো হয়েছিল স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধাদের ট্রেনিং সেন্টার। ভেতরের এবাদতখানা, ফোরকানিয়া মাদ্রাসা এবং শোয়ার ঘর সবকিছুই ব্যবহৃত হতো মুক্তিযোদ্ধাদের ক্যাম্প হিসেবে। নিজের দীর্ঘ সামরিক অভিজ্ঞতা ঢেলে দিয়ে কমান্ডার লতিফ চৌধুরী যুবকদের অস্ত্র চালনা ও গেরিলা যুদ্ধের নানা কলাকৌশল শেখাতেন।
পরবর্তীতে ভারত থেকে ট্রেনিং নিয়ে আসা বিপুল সংখ্যক মুক্তিযোদ্ধাও এই ক্যাম্পে যোগ দিলে এটি আনোয়ারা অঞ্চলের প্রধান অপারেশনাল হাবে পরিণত হয়।
লতিফ চৌধুরীর বীরত্বের খতিয়ান ও পাকবাহিনীর বর্বরতা
লতিফ গ্রুপের একের পর এক সফল অপারেশনে আনোয়ারা, বাঁশখালী ও চন্দনাইশের বিস্তির্ণ এলাকা শত্রুমুক্ত হতে শুরু করে।
আনোয়ারা থানা অপারেশন এবং পশ্চিম আনোয়ারার রাজাকার ক্যাম্প গুঁড়িয়ে দেওয়ার পর ভীতসন্ত্রস্ত রাজাকাররা এলাকা ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়। এমনকি গহিরার বঙ্গোপসাগরে অবস্থানরত পাকিস্তানি যুদ্ধজাহাজে মাইন বিস্ফোরণ ঘটিয়ে বাংলাদেশে তাক লাগিয়ে দিয়েছিল এই লতিফ গ্রুপ।
কিন্তু এই বীরত্বের চড়া মূল্য দিতে হয়েছিল চৌধুরী পরিবারকে। ১৯৭১ সালের নভেম্বর মাসের দিকে রাজাকারদের সহায়তায় পাকবাহিনীর এক বিশাল বহর বারখাইন গ্রামে যৌথ হামলা চালায়। আগাম খবর পেয়ে কমান্ডার লতিফ চৌধুরী তাঁর বাহিনী নিয়ে কৌশলগতভাবে বাঁশখালীর চাঁদপুর পাহাড়ে অবস্থান নেন। মুক্তিসেনাদের না পেয়ে ক্ষিপ্ত পাকিস্তানি বাহিনী ও আল-বদররা আব্দুল লতিফ চৌধুরীর সেই ঐতিহাসিক বাড়ি ও সংলগ্ন হিন্দু অধ্যুষিত পাড়াগুলো জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ছারখার করে দেয়। বর্বররা নির্বিচারে গুলি করে হত্যা করে বেশ কয়েকজন নিরীহ গ্রামবাসীকে এবং আবিদুল লতিফের চাচাত ভাই আব্দুল মাবুদ চৌধুরীর বৃদ্ধ পিতা আলহাজ্ব আলী মিয়া চৌধুরীকে অমানুষিক নির্যাতন করে গুরুতর জখম করে।
বাড়িঘর হারিয়েও দমে যাননি এই বীরেরা। পরবর্তীতে তৈলারদ্বীপ বারখাইন এরশাদ আলী স্কুলে নতুন ক্যাম্প স্থাপন করে যুদ্ধ চালিয়ে যান তাঁরা। অবশেষে ১৬ ডিসেম্বর রেসকোর্সের বিজয়ের সমান্তরালে কমান্ডার আবদুল লতিফ চৌধুরীর নেতৃত্বে সেই স্কুল মাঠেই স্বাধীন বাংলাদেশের লাল-সবুজের পতাকা উত্তোলিত হয়।
যুদ্ধপরবর্তী আনোয়ারার উন্নয়নে ভূমিকা
দেশ স্বাধীন হওয়ার পর আব্দুল মাবুদ চৌধুরী ‘CORR’ এর অধীনস্থ রিলিফ কমিটির চেয়ারম্যান হিসেবে যুদ্ধবিধ্বস্ত আনোয়ারা পুনর্গঠনে আত্মনিয়োগ করেন। ঘরবাড়ি হারানো মানুষদের মাঝে বিনামূল্যে টিন, গৃহনির্মাণ সামগ্রী ও খাদ্য বিতরণ করে অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন তিনি।
অন্যদিকে, কমান্ডার আবদুল লতিফ চৌধুরী যুদ্ধশেষে ফিরে যান এক নিভৃত ও সাদামাটা জীবনে। কোনো পদক, ক্ষমতা বা প্রচারণার মোহ তাঁকে স্পর্শ করতে পারেনি। সবসময় সাদা পোশাক এবং সাদা টুপি পরিহিত এই সদা হাস্যোজ্জ্বল মানুষটি এলাকার মানুষের সুখ-দুঃখে আমৃত্যু পাশে ছিলেন। দীর্ঘ জীবনসংগ্রাম শেষে ২০০৩ সালের ১ জুন ৮৫ বছর বয়সে আনোয়ারার এই মহানায়ক শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
কমান্ডার আবদুল লতিফের নাতি সাঈদ মাহমুদের স্মৃতিচারণ
কমান্ডার আবদুল লতিফ চৌধুরীর উত্তরাধিকাররা আজ দাদুর রেখে যাওয়া সেই গৌরবময় ইতিহাসকে বুকে ধারণ করে পরম শ্রদ্ধায় মাথা উঁচু করে বাঁচছেন। তাঁর নাতি সাঈদ মাহমুদ দাদুকে স্মরণ করতে গিয়ে প্রিয় আনোয়ারাকে বলেন, "আমার দাদা ছিলেন একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা। ১৯৭১ এ তিনি এনে দিয়েছেন আমার এই লাল-সবুজের পতাকা। রাইফেল ছিল হাতে, চোখে ছিল দেশের স্বপ্ন - আর বুকে ছিল অদম্য সাহস। তাঁর ত্যাগের জন্যই আজ আমি মাথা উঁচু করে বলি, আমি বাংলাদেশি। স্যালুট দাদা, তোমার প্রতি চিরকৃতজ্ঞ।"
আনোয়ারার মাটিতে লতিফ গ্রুপের বীরত্ব এবং আনোয়ারার তরুণ প্রজন্মকে মনে করিয়ে দেয় বাংলাদেশ কোনো দানে পাওয়া ভূখণ্ড নয়, এটি লতিফ চৌধুরীদের মতো প্রচারবিমুখ সূর্যসন্তানদের রক্ত, ত্যাগ ও অদম্য সাহসের বিনিময়ে অর্জিত এক মহাকাব্য।