কর্ণফুলীতে ১০০ শয্যার হাসপাতাল নির্মাণের উদ্যোগে স্থানীয়দের চরম অসন্তোষ
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে উপজেলা পরিষদ ভবনের পাশে প্রায় ৪ দশমিক ৭ একর জমিতে এই ২৫০ শয্যার হাসপাতাল নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল।
কর্ণফুলী উপজেলা কমপ্লেক্স | ফটো: সংগৃহীত
প্রতিষ্ঠার প্রায় এক দশক পেরিয়ে গেলেও চট্টগ্রামের কর্ণফুলী উপজেলায় এখনো কোনো পূর্ণাঙ্গ সরকারি স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স গড়ে ওঠেনি। ফলে উপজেলার আড়াই লাখের বেশি মানুষ প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
এরই মধ্যে বহুল প্রত্যাশিত ২৫০ শয্যার জেনারেল হাসপাতাল নির্মাণের পরিকল্পনা থেকে সরে এসে ১০০ শয্যার হাসপাতাল নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়ায় স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ ও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
বুধবার (১ জুলাই) বিকেলে বিষয়টি নিশ্চিত করে কর্ণফুলী উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মোছাম্মৎ জেবুন্নেসা জানান, ২৫০ শয্যার পরিবর্তে বর্তমানে ১০০ শয্যার হাসপাতাল নির্মাণের প্রস্তাবনা নিয়ে দাপ্তরিক কার্যক্রম চলছে। পরিকল্পনা ঘোষণার মাত্র এক বছরের মাথায় শয্যাসংখ্যা কমিয়ে আনার এই সিদ্ধান্তে স্থানীয়দের মধ্যে অসন্তোষের সৃষ্টি হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ২০১৬ সালের ৯ মে পটিয়া উপজেলার চরলক্ষ্যা, জুলধা, চরপাথরঘাটা, শিকলবাহা ও বড়উঠান ইউনিয়ন নিয়ে কর্ণফুলী উপজেলা গঠিত হয়। শিল্পসমৃদ্ধ এই উপজেলায় গার্মেন্টস, সিমেন্ট, সয়াবিন তেল, চিনি ও ইস্পাত কারখানাসহ বিভিন্ন ডকইয়ার্ড এবং সরকারি-বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রে দেশের বিভিন্ন জেলার বিপুলসংখ্যক মানুষ কর্মরত রয়েছেন। অথচ বিশাল এই শিল্পাঞ্চলের কর্মজীবী ও সাধারণ মানুষের জন্য এখানে এখনো কোনো পূর্ণাঙ্গ সরকারি হাসপাতাল প্রতিষ্ঠিত হয়নি।
পরবর্তীতে ২০২৫ সালের ১ জুলাই কর্ণফুলী উপজেলার ক্রসিং এলাকায় প্রস্তাবিত ২৫০ শয্যার জেনারেল হাসপাতালের জন্য নির্ধারিত জমি জরিপ ও চিহ্নিতকরণের কাজ শুরু হয়। চট্টগ্রামের সিভিল সার্জন ডা. মো. জাহাঙ্গীর হোসেনের উপস্থিতিতে তখন জমি পরিমাপ ও প্রাথমিক দখল কার্যক্রম সম্পন্ন হয়। পরে একই বছরের ২১ জুলাই গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের প্রকৌশলী ও স্থপতিরা প্রকল্প এলাকা পরিদর্শন করে আনুষ্ঠানিক কর্মপরিকল্পনা নির্ধারণ করেছিলেন।
অফিসিয়াল সূত্র জানায়, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে উপজেলা পরিষদ ভবনের পাশে প্রায় ৪ দশমিক ৭ একর জমিতে এই ২৫০ শয্যার হাসপাতাল নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। তবে বিগত এক বছরেও প্রকল্পের ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট প্রপোজাল (ডিপিপি) অনুমোদন না পাওয়ায় পুরো প্রকল্পটি অনিশ্চয়তার মুখে পড়ে। বর্তমানে সেই পরিকল্পনা সংশোধন করে ১০০ শয্যার হাসপাতাল নির্মাণের প্রস্তাবনা নিয়ে কাজ এগোচ্ছে।
এদিকে সরেজমিনে দেখা গেছে, উপজেলার মানুষের চিকিৎসার প্রধান ভরসা এখন একটি অস্থায়ী স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র, যেখানে কেবল অর্ধবেলা চিকিৎসাসেবা দেওয়া হয়। বিকেলের পর চিকিৎসকেরা চলে গেলে সেখানে কার্যত চিকিৎসাসেবা বন্ধ হয়ে যায়। স্থানীয়দের অভিযোগ, জরুরি প্রয়োজনে সরকারি অ্যাম্বুলেন্স থাকলেও সময়মতো সেই সেবা পাওয়া যায় না।
এছাড়া উপজেলার পাঁচ ইউনিয়নে মোট ১১টি কমিউনিটি ক্লিনিক থাকলেও অধিকাংশ কেন্দ্রেই পর্যাপ্ত চিকিৎসক ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সরঞ্জাম নেই। ফলে সাধারণ মানুষ বাধ্য হয়ে চট্টগ্রাম নগরীতে চিকিৎসা নিতে যান, যা দরিদ্র মানুষের জন্য অত্যন্ত ব্যয়বহুল ও কষ্টসাধ্য।
স্বাস্থ্যসেবার এই সংকটের বিষয়ে বড়উঠান ইউনিয়নের বাসিন্দা ও কর্ণফুলী উপজেলা যুবদলের সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক জাহেদুল ইসলাম শামীম বলেন, উপজেলা ঘোষণার পর প্রশাসনিক সুবিধা বাড়লেও স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রে কর্ণফুলীবাসী এখনো পুরোপুরি বঞ্চিত। স্থানীয় শিল্পাঞ্চল ও বিশাল জনসংখ্যার কথা বিবেচনায় রেখে এখানে একটি ২৫০ শয্যার হাসপাতাল অত্যন্ত প্রয়োজন। এই বিষয়ে সরকারের দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া উচিত।
সার্বিক বিষয়ে উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মোছাম্মৎ জেবুন্নেসা বলেন, "উপজেলা পরিষদের পাশে ৪ দশমিক ৭ একর জমিতে ১০০ শয্যার হাসপাতাল নির্মাণের প্রস্তাবসংবলিত একটি দাপ্তরিক চিঠি আমরা পেয়েছি। উপজেলা প্রতিষ্ঠার প্রায় ১০ বছর হতে চললেও পূর্ণাঙ্গ হাসপাতাল প্রতিষ্ঠিত না হওয়া দুঃখজনক।
আগে ২৫০ শয্যার হাসপাতালের সিদ্ধান্ত থাকলেও পরবর্তীতে তা ১০০ শয্যায় নামিয়ে আনার সিদ্ধান্ত হয়েছে। মাঝে ৫০ শয্যার হাসপাতাল নির্মাণের বিষয়ে কিছু আলোচনা শোনা গেলেও এ সংক্রান্ত কোনো আনুষ্ঠানিক বা দাপ্তরিক চিঠি এখনো আমরা পাইনি।"