ব্রেকিং
উপজেলা সাংবাদিকতার সংকটঃ প্রভাব ও নীরবতার রাজনীতি আনোয়ারাসহ চট্টগ্রামে বন্যা ও পাহাড়ধসে ১৩ জনের মৃত্যু, ক্ষতিগ্রস্ত ৬ লাখ মানুষ আনোয়ারায় বন্যাদুর্গতদের পাশে বিরোধীদলীয় চিপ হুইপ নাহিদ ইসলাম আনোয়ারায় বন্যার্তদের পাশে সরওয়ার জামাল নিজাম কর্ণফুলীতে ব্রাজিলের তৈরী পিস্তল উদ্ধার আনোয়ারায় পানিবন্দী মানুষদের ত্রাণসামগ্রী দিলেন ইউএনও রেকর্ড বৃষ্টিতে আনোয়ারায় বিপর্যয় টানা বৃষ্টিতে কর্ণফুলীতে তলিয়ে গেছে নিম্নাঞ্চল আনোয়ারার ‘লতিফ গ্রুপ’ ও একজন মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার আবদুল লতিফ চৌধুরী আনোয়ারায় পাহাড়ী ঢল ও আকস্মিক বন্যার শঙ্কাঃ ভাঙন আতঙ্কে উপকূলবাসী উপজেলা সাংবাদিকতার সংকটঃ প্রভাব ও নীরবতার রাজনীতি আনোয়ারাসহ চট্টগ্রামে বন্যা ও পাহাড়ধসে ১৩ জনের মৃত্যু, ক্ষতিগ্রস্ত ৬ লাখ মানুষ আনোয়ারায় বন্যাদুর্গতদের পাশে বিরোধীদলীয় চিপ হুইপ নাহিদ ইসলাম আনোয়ারায় বন্যার্তদের পাশে সরওয়ার জামাল নিজাম কর্ণফুলীতে ব্রাজিলের তৈরী পিস্তল উদ্ধার আনোয়ারায় পানিবন্দী মানুষদের ত্রাণসামগ্রী দিলেন ইউএনও রেকর্ড বৃষ্টিতে আনোয়ারায় বিপর্যয় টানা বৃষ্টিতে কর্ণফুলীতে তলিয়ে গেছে নিম্নাঞ্চল আনোয়ারার ‘লতিফ গ্রুপ’ ও একজন মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার আবদুল লতিফ চৌধুরী আনোয়ারায় পাহাড়ী ঢল ও আকস্মিক বন্যার শঙ্কাঃ ভাঙন আতঙ্কে উপকূলবাসী
মতামত ব্রেকিং

উপজেলা সাংবাদিকতার সংকটঃ প্রভাব ও নীরবতার রাজনীতি

সাইফুল ইসলাম সাইফ ১২ জুলাই ২০২৬ রাত ৯:৬ সময়

এই সংকটের শুরু অনেক ক্ষেত্রেই অর্থনৈতিক ভিত্তি থেকে। দেশের অসংখ্য উপজেলা সংবাদদাতা বছরের পর বছর কোনো বেতন ছাড়াই কাজ করেন।

উপজেলা সাংবাদিকতার সংকটঃ প্রভাব ও নীরবতার রাজনীতি

ফটো: সংগৃহীত

গণতান্ত্রিক সমাজে সাংবাদিকতাকে বলা হয় রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ। রাজধানীর বাইরে জেলা, উপজেলা ও গ্রামীণ জনপদে এই দায়িত্ব পালন করার কথা মফস্বল সাংবাদিকদের। তারাই স্থানীয় মানুষের চোখ, কান এবং কণ্ঠস্বর হওয়ার কথা। কিন্তু বাংলাদেশের বহু এলাকায় বাস্তবতা এমন এক সংকটের দিকে এগিয়েছে, যেখানে সাংবাদিকতার মূল উদ্দেশ্য এবং বাস্তব চর্চার মধ্যে বড় ধরনের ব্যবধান তৈরি হয়েছে।

এই সংকটের শুরু অনেক ক্ষেত্রেই অর্থনৈতিক ভিত্তি থেকে। দেশের অসংখ্য উপজেলা সংবাদদাতা বছরের পর বছর কোনো বেতন ছাড়াই কাজ করেন। অনেক জাতীয় ও আঞ্চলিক সংবাদমাধ্যম স্থানীয় প্রতিনিধিদের কাছ থেকে সংবাদ সংগ্রহ করলেও তাদের ন্যূনতম আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করে না। উল্টো বিজ্ঞাপন সংগ্রহের লক্ষ্য বেঁধে দেওয়া হয়। কোথাও কোথাও সংবাদদাতাদের পরিচয়পত্র ধরে রাখতে কিংবা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখতে বিজ্ঞাপন বা কমিশন জোগাড় করতে হয়। ফলে সাংবাদিকতা একটি পেশা না হয়ে অনেক সময় টিকে থাকার সংগ্রামে পরিণত হয়।

যখন একজন সংবাদকর্মীর আয়ের বৈধ ও স্থায়ী উৎস থাকে না, তখন অনৈতিক অর্থ উপার্জনের পথ খুলে যায়। স্থানীয় ব্যবসায়ী, ঠিকাদার, রাজনৈতিক নেতা, জনপ্রতিনিধি কিংবা প্রশাসনিক ব্যক্তিদের সঙ্গে স্বার্থভিত্তিক সম্পর্ক গড়ে ওঠে। সংবাদ তখন আর সত্য প্রকাশের মাধ্যম থাকে না, বরং হয়ে ওঠে দরকষাকষি, সুবিধা আদায় অথবা সম্পর্ক রক্ষার একটি উপকরণ।

এই বাস্তবতায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় সাধারণ মানুষ। কারণ অনেক ক্ষেত্রে সংবাদ প্রকাশের অগ্রাধিকার নির্ধারিত হয় জনস্বার্থের ভিত্তিতে নয়, বরং ক্ষমতা ও অর্থের ভিত্তিতে। যার অর্থ আছে, যার প্রভাব আছে, যার সঙ্গে সম্পর্ক আছে, তার খবর গুরুত্ব পায়। আর যাদের নেই, তাদের দুর্ভোগ, বঞ্চনা ও অধিকারহীনতা সংবাদপত্রের পাতায় কিংবা অনলাইন পোর্টালের শিরোনামে জায়গা পায় না।

মফস্বল সাংবাদিকতার আরেকটি বড় দুর্বলতা হলো অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার অভাব। স্থানীয় পর্যায়ে ক্ষমতাবান ব্যক্তি, রাজনৈতিক নেতা, প্রভাবশালী ব্যবসায়ী, ভূমিদস্যু, দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা বা অপরাধচক্রের বিরুদ্ধে গভীর অনুসন্ধান খুব কমই দেখা যায়। এর পেছনে দুটি কারণ প্রায়ই আলোচিত হয়। প্রথমত, ভয়। ছোট শহর বা উপজেলায় সবাই সবাইকে চেনে। প্রভাবশালীদের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া অনেক সময় ব্যক্তিগত নিরাপত্তার ঝুঁকি তৈরি করে। দ্বিতীয়ত, স্বার্থের সম্পর্ক। যাদের বিরুদ্ধে অনুসন্ধান হওয়ার কথা, অনেক ক্ষেত্রেই তাদের কাছ থেকেই বিভিন্ন সুবিধা বা আর্থিক সহায়তা পাওয়া যায়। ফলে সত্য অনুসন্ধানের পরিবর্তে নীরবতা বেছে নেওয়া হয়।

ধরা যাক, কোনো ধর্ষণ, নারী নির্যাতন বা ক্ষমতার অপব্যবহারের ঘটনায় একজন প্রভাবশালী ব্যক্তি জড়িত। প্রথম দিন হয়তো একটি সাধারণ সংবাদ প্রকাশিত হলো। কিন্তু এর পরের পরিস্থিতি কী? মামলার অগ্রগতি কোথায়? সাক্ষীদের ওপর চাপ আছে কি না? তদন্ত সঠিকভাবে হচ্ছে কি না? ভুক্তভোগী পরিবার ন্যায়বিচার পাচ্ছে কি না? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজে বের করার জন্য যে ধারাবাহিক অনুসন্ধানী ও ফলো-আপ সাংবাদিকতা প্রয়োজন, তা অনেক ক্ষেত্রেই অনুপস্থিত। ফলে ঘটনাটি ধীরে ধীরে জনস্মৃতি থেকে হারিয়ে যায় এবং প্রভাবশালী ব্যক্তি দায়মুক্তি পেয়ে যায়।

এখানেই সাংবাদিকতার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বটি ব্যর্থ হয়। কারণ সংবাদ প্রকাশের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো সত্যের শেষ পরিণতি পর্যন্ত অনুসরণ করা। একটি ঘটনা জানানো সাংবাদিকতার শুরু, কিন্তু জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা সাংবাদিকতার প্রকৃত সাফল্য।

ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দল এবং প্রশাসনের সঙ্গে অতিরিক্ত ঘনিষ্ঠতাও মফস্বল সাংবাদিকতার স্বাধীনতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। অনেক সাংবাদিক ক্ষমতার কেন্দ্রের কাছাকাছি অবস্থান করাকে পেশাগত সাফল্য মনে করেন। ফলে তারা জনগণের প্রতিনিধি না হয়ে অনেক সময় ক্ষমতার অনানুষ্ঠানিক মুখপাত্রে পরিণত হন। স্থানীয় মানুষের অভিযোগ, দুর্নীতি, অনিয়ম কিংবা সেবাবঞ্চনার চেয়ে সরকারি কার্যক্রমের প্রচারই বেশি গুরুত্ব পায়।

এই প্রবণতার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ভয়াবহ। যখন গণমাধ্যম সমাজের প্রকৃত সমস্যা তুলে ধরে না, তখন শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সড়ক, পানি, পরিবেশ, আইনশৃঙ্খলা এবং স্থানীয় শাসনব্যবস্থার দুর্বলতাগুলোও আড়ালে থেকে যায়। সমস্যাগুলো অদৃশ্য হয়ে যায় না, বরং আরও গভীরে প্রোথিত হয়। ফলে সমাজের প্রাতিষ্ঠানিক ও অবকাঠামোগত দুর্বলতা ক্রমশ বাড়তে থাকে।

মফস্বল সাংবাদিকতায় সিন্ডিকেট সংস্কৃতির অভিযোগও নতুন নয়। অনেক এলাকায় প্রেসক্লাব বা সাংবাদিক সংগঠন কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তির নিয়ন্ত্রণে থাকে। নতুন সদস্য অন্তর্ভুক্তি, নেতৃত্ব নির্বাচন, সংবাদ প্রবাহ কিংবা পেশাগত সুযোগের ক্ষেত্রেও গোষ্ঠীগত প্রভাব কাজ করে। ফলে স্বাধীন মত, সমালোচনামূলক অবস্থান কিংবা নতুন প্রজন্মের সাংবাদিকদের জন্য জায়গা সংকুচিত হয়ে যায়।

ফলাফল হিসেবে তৈরি হয় এক ধরনের বদ্ধ পেশাগত পরিবেশ, যেখানে যোগ্যতার চেয়ে আনুগত্য বেশি মূল্যবান হয়ে ওঠে। অনেক তরুণ সাংবাদিককে নিরুৎসাহিত করা হয়, আবার কেউ কেউ পেশা ছেড়ে দিতে বাধ্য হন। এতে সাংবাদিকতা তার সবচেয়ে প্রয়োজনীয় সম্পদ, অর্থাৎ স্বাধীন চিন্তাশীল মানুষ হারাতে থাকে।

সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, এই কাঠামো ধীরে ধীরে আদর্শবিহীন সাংবাদিকতার জন্ম দেয়। এমন এক প্রজন্ম তৈরি হয়, যারা সাংবাদিকতাকে জনস্বার্থ রক্ষার পেশা হিসেবে নয়, বরং সামাজিক প্রভাব, ব্যক্তিগত পরিচিতি, ক্ষমতার কাছাকাছি থাকা কিংবা অর্থ উপার্জনের মাধ্যম হিসেবে দেখতে শেখে। এতে পেশার নৈতিক ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ে এবং জনগণের আস্থা কমে যায়।

তবে এই চিত্রই পুরো সাংবাদিকতার বাস্তবতা নয়। এখনও দেশের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলায় অসংখ্য সাহসী, সৎ এবং পেশাদার সাংবাদিক সীমিত সম্পদ নিয়েও জনস্বার্থে কাজ করে যাচ্ছেন। তারা হুমকি, চাপ এবং নানা সীমাবদ্ধতার মধ্যেও সত্য তুলে ধরার চেষ্টা করছেন। তাই সমস্যার সমাধান সাংবাদিকতাকে দুর্বল করা নয়; বরং মফস্বল সাংবাদিকতার অর্থনৈতিক, প্রাতিষ্ঠানিক এবং নৈতিক ভিত্তিকে শক্তিশালী করা।

প্রশ্নটি তাই খুবই সরল। মফস্বল সাংবাদিকতা কি জনগণের কণ্ঠস্বর হবে, নাকি ক্ষমতার প্রতিধ্বনি হয়ে থাকবে? এই প্রশ্নের উত্তর শুধু সাংবাদিকদের নয়, গণমাধ্যম মালিক, রাজনৈতিক নেতৃত্ব, প্রশাসন এবং সমগ্র সমাজকেই দিতে হবে। কারণ একটি সমাজে গণমাধ্যম যত স্বাধীন, জবাবদিহিমূলক এবং নৈতিক হবে, সেই সমাজও তত বেশি ন্যায়ভিত্তিক ও গণতান্ত্রিক হবে।

সম্পাদক, প্রিয় আনোয়ারা

ট্যাগ: #সাংবাদিকতা #সংবাদ
মন্তব্য (0)
আপনার মন্তব্য লিখুন
* চিহ্নিত তথ্য আবশ্যক। অশালীন মন্তব্য মুছে দেওয়া হবে।