শহীদ জিয়াউর রহমানঃ মুক্ত গণমাধ্যম ও বহুদলীয় গণতন্ত্রের বাতিঘর
জিয়াউর রহমানের হাত ধরেই সংবাদপত্র মুক্ত হয়েছিল একদলীয় বাকশালি ব্যবস্থা থেকে; বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যম পেয়েছিল নতুন স্বাধীনতা।
ফটো: প্রিয় আনোয়ারা
জিয়াউর রহমান। বাংলাদেশের রাখাল রাজা, খেটে খাওয়া মানুষের আস্থার নাম। যাঁর ‘উই রিভোল্ট’ (We Revolt) ঘোষণায় সূচনা হয়েছিল একটি স্বাধীন দেশের পথচলার। যিনি তলাবিহীন ঝুড়ি থেকে বাংলাদেশকে নিয়ে গেছেন উন্নত, সমৃদ্ধ ও অর্থনৈতিক মুক্তির পথে। একদলীয় শাসনব্যবস্থার কবর রচনা করে প্রতিষ্ঠা করেছেন বহুদলীয় গণতন্ত্র ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতার নিশ্চয়তা।
জিয়াউর রহমানের হাত ধরেই সংবাদপত্র মুক্ত হয়েছিল একদলীয় বাকশালি ব্যবস্থা থেকে; বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যম পেয়েছিল নতুন স্বাধীনতা। এই কারণেই জিয়াউর রহমান হয়ে উঠেছেন সংবাদপত্রের স্বাধীনতার জনক বা প্রাণপুরুষ। শুধু তাই নয়, বাংলাদেশের জন্মলগ্ন থেকে আজ পর্যন্ত জিয়াউর রহমান মানুষের মাঝে চিরঞ্জীব হয়ে আছেন তাঁর কর্ম, উদ্যোগ ও প্রবর্তিত ‘বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ’ পরিচয়ের মাধ্যমে। ইতিহাস মুছে ফেলার হাজারো ষড়যন্ত্র অতীতে কাজে আসেনি, ভবিষ্যতেও কাজে আসবে না।
যতদিন লাল-সবুজের পতাকা থাকবে, বাংলাদেশ নামক এই ভূখণ্ড থাকবে, ততদিন ইতিহাসের পাতায় ও জনতার মাঝে অমর হয়ে থাকবেন শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান।
পঁচাত্তরে একদলীয় শাসনব্যবস্থায় দেশের রাজনীতি স্তব্ধ হয়ে যায়, বহুমত প্রকাশের পথ রুদ্ধ হয় এবং কণ্ঠরোধ করা হয় সংবাদপত্রের। পত্রিকা বন্ধ, পেশাচ্যুতি ও বেকারত্বের কারণে তখন সাংবাদিকরা দিকনির্দেশনাহীন এক ছন্নছাড়া জীবন যাপন করছিলেন। তখন সাংবাদিকদেরও একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক কাঠামোয় যোগদানে বাধ্য করা হয়েছিল। এমন অবস্থায় রাজনৈতিক পটপরিবর্তন হলে সাংবাদিকরা আশান্বিত হয়ে ওঠেন।
নভেম্বর বিপ্লবের পর মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান সব দিকেই নজর দিতে শুরু করেন। গণতন্ত্র, সুশাসন ও উন্নয়নের সঙ্গে গণমাধ্যমের যে নিবিড়তম সম্পর্ক, তা তিনি গভীরভাবে উপলব্ধি করেছিলেন। গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করতে হলে অবশ্যই সাংবাদিকতার স্বাধীনতা নিশ্চিত করা অপরিহার্য অনুষঙ্গ। তাই ঐকান্তিক আগ্রহ থেকেই তিনি গণমাধ্যমের সঙ্গে গভীর ও প্রাণময় হৃদ্যতা গড়ে তোলেন। গণমাধ্যমকে মুক্ত ও স্বাধীন হিসেবে গড়ে তুলে পরিণত করেন সত্যিকারের রাষ্ট্রের 'চতুর্থ স্তম্ভ’ হিসেবে। কারণ তিনি মনে করতেন, দেশের সার্বিক স্থিতিশীলতা ও টেকসই উন্নয়নে গণমাধ্যম ব্যাপক অবদান রাখতে পারে।
জাতিসংঘের ১৯৪৮ সালের মানবাধিকারের সর্বজনীন ঘোষণাপত্রের সঙ্গে ঐকমত্য পোষণ করতেন জিয়াউর রহমান, যেখানে বলা হয়েছে, প্রত্যেকের মতামত ও মত প্রকাশের স্বাধীনতার অধিকার রয়েছে এবং এই অধিকারে কোনো হস্তক্ষেপ ছাড়াই তথ্য ও ধারণা অনুসন্ধান করা, গ্রহণ করা এবং যেকোনো মাধ্যমের সাহায্যে তা প্রচার করার স্বাধীনতা অন্তর্ভুক্ত।
গণমাধ্যম সম্পর্কে জন স্টুয়ার্ট মিলের মতের সঙ্গে একমত ছিলেন তিনি। তিনি মনে করতেন যে, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা থাকা উচিত এবং সত্য প্রকাশের মাধ্যমেই সমাজের উন্নতি হয়। তিনি বিশ্বাস করতেন, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা আমাদের মূল গণতান্ত্রিক শক্তির মেরুদণ্ড।
গণমাধ্যম যেকোনো রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক কাঠামোর এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। বিচার বিভাগ, নির্বাহী বিভাগ এবং আইনসভা এই তিনটি স্তম্ভের পাশাপাশি গণমাধ্যম সমাজে জবাবদিহিতা এবং স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান সংবাদপত্রের মুক্তি, বাকস্বাধীনতা এবং গণতন্ত্রের ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন। তাঁর সময়ে সাংবাদিকের কণ্ঠস্বর ছিল স্বাধীন, কলম ছিল উন্মুক্ত।
সাংবাদিকদের প্রশিক্ষণের জন্য বাংলাদেশ প্রেস ইনস্টিটিউট (পিআইবি) গড়ে তোলেন জিয়াউর রহমান। সাংবাদিকতার স্বাধীনতার জন্য প্রণীত আইনের বাস্তবায়ন করে প্রতিষ্ঠা করেন বাংলাদেশ প্রেস কাউন্সিল। জাতীয় প্রেস ক্লাব ও চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবসহ সাংবাদিকদের আবাসন সমস্যা সমাধানে তিনি মিরপুরে প্রায় ২৩ বিঘা জমি বরাদ্দ দিয়েছিলেন। একই সাথে চট্টগ্রামের সাংবাদিকদের জন্যও জায়গা বরাদ্দ দিয়ে আবাসন সমস্যা সমাধানে এগিয়ে এসেছিলেন বেগম খালেদা জিয়াও।
জিয়াউর রহমান ১৯৭৫ সালের ১৬ জুন নিষিদ্ধ করা সংবাদপত্রগুলো পুনরায় প্রকাশের অনুমতি দেন। ফলে নতুন করে প্রাণ ফিরে পায় দেশের সংবাদপত্র শিল্প। বন্ধ ঘোষিত পত্রিকাগুলো প্রকাশের পাশাপাশি নতুন দৈনিক, সাপ্তাহিক, অর্ধসাপ্তাহিক, পাক্ষিক এবং মাসিক পত্রিকা বের হতে শুরু করে। শিশু-কিশোরদের জন্য ‘কিশোর বাংলা’ নামে একটি সাপ্তাহিক পত্রিকার প্রকাশ হয়েছিল জিয়াউর রহমানের একান্ত আগ্রহে। পত্রিকাটি শিশু-কিশোরদের মধ্যে বেশ জনপ্রিয় ছিল। এছাড়াও ‘গণতন্ত্র’ নামে একটি রাজনৈতিক সাপ্তাহিক পত্রিকা প্রকাশেরও উদ্যোগ নেন তিনি। তাঁর ব্যক্তিগত প্রচেষ্টায় ১৯৭৯ সালের ১২ জুলাই প্রকাশিত হয়েছিল ‘দৈনিক দেশ’ পত্রিকা। অল্প কিছুদিনের মধ্যেই দেশব্যাপী পত্রিকাটি জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। অন্যায়, অবিচার এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে পত্রিকাটি ছিল সোচ্চার। মন্ত্রী, এমপি এবং সরকারি কর্মকর্তাদের দুর্নীতির খবরও পত্রিকাটিতে নিয়মিত প্রকাশিত হতো। শুধু সংবাদপত্রের প্রকাশ বা আবাসন সমস্যার সমাধান করেই তিনি ক্ষান্ত হননি, সাংবাদিকদের নিয়ে বিদেশ সফরও করতেন এই মহান নেতা। দেশের বাইরে নানা রাষ্ট্রীয় সফরে সঙ্গী করতেন সাংবাদিকদের; তাঁদের কাছ থেকে নানাবিধ সমস্যার কথা জেনে তা সমাধানের চেষ্টা করতেন।
সংবাদপত্রের যেকোনো সমালোচনাকে তিনি ইতিবাচকভাবে নিতেন এবং সাংবাদিকদের প্রশ্নের খোলামেলা জবাব দিতেন। প্রিন্ট মাধ্যম ছাড়াও অন্যান্য মাধ্যমের উন্নয়নেও প্রেসিডেন্ট জিয়া গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। বাংলাদেশ টেলিভিশনকে আকর্ষণীয় করার জন্য রঙিন মাধ্যমে রূপান্তর করা হয়। সংসদ কার্যক্রম দেখানোর জন্য বিটিভির দ্বিতীয় চ্যানেল চালু করা হয়; অনুষ্ঠান এবং খবরে আনা হয় বৈচিত্র্য। একইভাবে বাংলাদেশ বেতারেও আধুনিক পরিবর্তন আনা হয়। চলচ্চিত্রের উন্নয়নে মুক্তিযুদ্ধসহ বেশ কয়েকটি সামাজিক চলচ্চিত্র তৈরিতে জিয়াউর রহমানের সরকার অনুদান প্রদান শুরু করে।
এমন একজন রাষ্ট্রনায়ক স্বাধীনতার এত বছরেও বাংলাদেশের ভাগ্যে আর জোটেনি। ফলে জিয়াউর রহমানকে মুক্ত গণমাধ্যমের জনক বা গণমাধ্যমবান্ধব রাষ্ট্রনায়ক বললে তা কোনোভাবেই বেশি বলা হবে না।
বর্তমানে শহীদ জিয়াউর রহমান ও বেগম খালেদা জিয়ার যোগ্য উত্তরসূরি হিসেবে দেশ ও জাতির ভরসাস্থলে পরিণত হয়েছেন এই দম্পতির সন্তান তারেক রহমান। যাঁর নেতৃত্ব ও মেধায় বিএনপি এখন দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলে পরিণত হয়েছে।
দীর্ঘ প্রবাস বা নির্বাসিত জীবন শেষে দেশে ফেরার পর নিত্যনতুন রাজনৈতিক দূরদর্শিতা দেখিয়ে জনগণের মনের মণিকোঠায় জায়গা করে নিয়েছেন তারেক রহমান। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের প্রতিচ্ছবি তারেক রহমানের মাঝে দেখছে বাংলাদেশ। পিতার মতো তারেক রহমানও স্বাগত জানিয়েছেন সংবাদপত্রের যেকোনো আলোচনা-সমালোচনাকে।
সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে ক্যামেরার পেছনের মানুষ বা ক্যামেরাম্যানসহ সাংবাদিকদের সাথে তাঁর যে আন্তরিকতার বহিঃপ্রকাশ আমরা দেখেছি, তাতে দেশবাসী আশাবাদী শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের মতো গণমাধ্যম ও সাংবাদিকদের কল্যাণে আগামীতেও প্রাণ উজার করে কাজ করবেন তিনি।
জিয়াউর রহমানের শাসনামলের মতো আগামী দিনে তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সময়েও সাংবাদিকের কণ্ঠস্বর থাকবে সম্পূর্ণ মুক্ত ও স্বাধীন।
ইমরান এমি
সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক
ইমেইলঃ emranamiy@gmail.com