চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতা ও নাগরিক দায়িত্ব
সিটি করপোরেশনের মূল কাজ নালা-নর্দমা পরিষ্কার রাখা, যা সংস্থাটি নিয়মিত করে যাচ্ছে। কিন্তু পরিষ্কার করার কদিন যেতে না যেতেই নালাগুলো আবার ময়লা-আবর্জনা আর প্লাস্টিক বর্জ্যে ভরাট হয়ে যাচ্ছে। প্রশ্ন হলো, এই বিপুল পরিমাণ বর্জ্য নালায় ফেলছে কারা?
কোলাজঃ প্রিয় আনোয়ারা | ফটো: প্রিয় আনোয়ারা
জলাবদ্ধতা চট্টগ্রাম মহানগরীর সবচেয়ে বড় ও দীর্ঘমেয়াদি অভিশাপ। এই সমস্যা সমাধানে সরকার মেগা প্রকল্পের মাধ্যমে খাল খনন করে পানি প্রবাহ নিশ্চিত করার কাজ করে যাচ্ছে। এরই মধ্যে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ) পরিচালিত মেগা প্রকল্পের কাজ প্রায় ৮০ শতাংশ শেষ হয়েছে। তা সত্ত্বেও কেন জলাবদ্ধতা কমছে না এটি এখন নগরবাসীর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। আর এই প্রশ্নের তির স্বাভাবিকভাবেই তাক করা থাকে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন তথা মেয়ারের দিকে।
অথচ বাস্তব চিত্র হলো, মেগা প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে সিডিএ। সিটি করপোরেশনের মূল কাজ নালা-নর্দমা পরিষ্কার রাখা, যা সংস্থাটি নিয়মিত করে যাচ্ছে। কিন্তু পরিষ্কার করার কদিন যেতে না যেতেই নালাগুলো আবার ময়লা-আবর্জনা আর প্লাস্টিক বর্জ্যে ভরাট হয়ে যাচ্ছে। প্রশ্ন হলো, এই বিপুল পরিমাণ বর্জ্য নালায় ফেলছে কারা? উত্তরটা আমাদের সবার জানা; আমরা, অর্থাৎ নগরবাসী নিজেই।
এক গবেষণায় দেখা গেছে, চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতার জন্য ৬৩ শতাংশ ক্ষেত্রে মনুষ্যসৃষ্ট কারণ দায়ী। এর মধ্যে রয়েছে অপর্যাপ্ত ড্রেনেজ ব্যবস্থা, নিয়মিত খাল ও নালা পরিষ্কারের অভাব, অপরিকল্পিত বাঁধ, সেতু, কালভার্ট ও সড়ক নির্মাণ, পাহাড় কর্তন এবং পুকুর ও জলাশয় ভরাট। এছাড়া শহরের নানা বর্জ্য, প্লাস্টিক, পাহাড়ের মাটি, ভবনের নির্মাণ সামগ্রী ও পাইলিংয়ের বালি-মাটি এবং বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি সংস্থার ভূগর্ভস্থ সরবরাহ লাইনের কারণে ড্রেনেজ ব্যবস্থায় মারাত্মক প্রতিবন্ধকতা তৈরি হচ্ছে। এর পাশাপাশি রয়েছে অপরিকল্পিত নগরায়ণ ও ভূমির যথেচ্ছ ব্যবহার পরিবর্তন। বিপরীতে, প্রাকৃতিক কারণ দায়ী মাত্র ৩৭ শতাংশ। সুতরাং, জলাবদ্ধতার এই চরম সংকট থেকে মুক্তি পেতে হলে সর্বাগ্রে মানুষকে সচেতন হতে হবে। বিশেষ করে নালা-নর্দমায় গৃহস্থালি বর্জ্য, প্লাস্টিক ও পলিথিন ফেলা সম্পূর্ণ বন্ধ করতে হবে। মূলত নাগরিক অসচেতনতাই নালা ভরাট হওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ।
বর্তমানে চট্টগ্রামে প্রতিদিন প্রায় তিন হাজার টন বর্জ্য উৎপাদিত হয়। এর মধ্যে সিটি করপোরেশনের দৈনিক বর্জ্য অপসারণের সক্ষমতা রয়েছে মাত্র ২ হাজার থেকে ২ হাজার ২০০ টন। অর্থাৎ, প্রতিদিন প্রায় ৮০০ থেকে ১ হাজার টন বর্জ্য (মোট বর্জ্যের প্রায় ৩০ শতাংশ) নগরীর বিভিন্ন স্থানেই রয়ে যায়। পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম জোরদারে প্রায় ৩ হাজার পরিচ্ছন্নতাকর্মী মাঠে কাজ করলেও উৎপাদিত বর্জ্যের পরিমাণের সঙ্গে তারা কুলিয়ে উঠতে পারছেন না। এই অপসারিত না হওয়া বর্জ্যের একটি বড় অংশ শেষ পর্যন্ত গিয়ে পড়ে নগরীর খাল, ড্রেন কিংবা খোলা জলাশয়ে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নাগরিকদের একটি বড় অংশের অসচেতনতা, যারা নির্ধারিত স্থানে ময়লা না ফেলে সড়ক, নালা কিংবা বাড়ির পাশে যত্রতত্র বর্জ্য ফেলেন। সচেতনতা বৃদ্ধিতে সিটি করপোরেশন নানা প্রচারণা ও ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান চালালেও এই ক্ষতিকর প্রবণতা পুরোপুরি বন্ধ করা যায়নি। ফলে বৃষ্টির পানির সাথে এই বর্জ্যগুলো ড্রেন ও খালের মুখে গিয়ে পানি চলাচলের পথ পুরোপুরি বন্ধ করে দেয়। তখন কয়েক ঘণ্টার টানা বৃষ্টিতেই নগরী প্লাবিত হয়।
চট্টগ্রামের মেয়র হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই ডা. শাহাদাত হোসেন জলাবদ্ধতা নিরসনকে প্রধান চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েছেন। নগরবাসীর সেবা নিশ্চিত করতে তিনি দিন-রাত, এমনকি গভীর রাত পর্যন্ত নগরীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ছুটে চলছেন। কিন্তু যতক্ষণ না নগরবাসী নিজে থেকে সচেতন হবে, ততক্ষণ এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান কোনোভাবেই সম্ভব নয়। মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন নগরবাসীকে প্রায়শই একটি যৌক্তিক কথা স্মরণ করিয়ে দেন, ‘এই নগর শুধু মেয়রের একার নয়, এটি ৮০ লাখ নগরবাসীর। যারা এখানে বসবাস করছেন, শহরটি সবার। তাই সবাইকে সচেতন হতে হবে; খাল-নালায় ময়লা-আবর্জনা ফেলা বন্ধ করতে হবে এবং নালা-খাল দখল করা যাবে না।’
কিন্তু প্রশ্ন হলো, আমরা কি আদৌ সচেতন হয়েছি? এই শহরকে কি আমরা নিজেদের মনে করতে পেরেছি? এই মুহূর্তে চট্টগ্রামের অস্তিত্ব রক্ষায় প্রত্যেকের দায়িত্বশীল নাগরিকের ভূমিকা পালন করা অত্যন্ত জরুরি। সম্প্রতি চট্টগ্রামে টানা ৫ দিনে রেকর্ড ১০২০.৯ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে। মৌসুমি বায়ু ও বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট লঘুচাপের প্রভাবে হওয়া এই অতি ভারী বর্ষণে চট্টগ্রাম শহরসহ দক্ষিণ চট্টগ্রামের উপজেলাগুলোতে ভয়াবহ জলাবদ্ধতা ও বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের এই চরম বাস্তবতায় প্রকৃতির ওপর তো আমাদের হাত নেই, কিন্তু মনুষ্যসৃষ্ট কারণগুলো নিয়ন্ত্রণ করা তো আমাদের হাতেই। মেগা প্রকল্প কিংবা নগরপিতার একার প্রচেষ্টায় জলমগ্ন চট্টগ্রামকে বাঁচানো যাবে না, যদি না ৮০ লাখ নগরবাসী এই শহরকে ভালোবেসে নিজ নিজ দায়িত্ব পালন করেন। যত্রতত্র ময়লা ফেলা বন্ধ হোক, সুস্থ ও বাসযোগ্য হোক আমাদের চট্টগ্রাম।
লেখকঃ
ইমরান এমি
সাংবাদিক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও ক্রীড়া সংগঠক
সদস্য সচিব, পলিটিক্যাল রিপোর্টার্স ইউনিটি-পিআরইউ
মুঠোফোন : ০১৮৩৩০০৫৫০৭