রেকর্ড বৃষ্টিতে আনোয়ারায় বিপর্যয়
৪ দিনের রেকর্ড বৃষ্টিতে আনোয়ারায় মানবিক বিপর্যয়ঃ বিদ্যুৎহীন অন্ধকারে ৯০ হাজার গ্রাহক, জনমনে ক্ষোভ বাড়ছে।
বৈরাগ ইউনিয়নে বন্যা পরিস্থিতি | ফটো: প্রিয় আনোয়ারা
টানা চার দিনের রেকর্ড ভাঙা বর্ষণ ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে আনোয়ারায় ভয়াবহ বন্যা ও জলাবদ্ধতা পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। উপজেলার ১১টি ইউনিয়নের নিচু এলাকা প্লাবিত হয়ে অন্তত অর্ধলাখ মানুষ এখন পানিবন্দি। একই সঙ্গে গত তিন দিন ধরে পুরো উপজেলা বিদ্যুৎহীন থাকায় ৯০ হাজারেরও বেশি গ্রাহক চরম সংকটে পড়েছেন। সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়া, দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকা এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় সেবার অভাবে ওই অঞ্চলে এক মানবিক বিপর্যয়কর পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
ভারী বর্ষণের কারণে আনোয়ারার অভ্যন্তরীণ ও প্রধান সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছে। সড়ক, বসতঘর ও আঙিনা পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় মানুষের স্বাভাবিক চলাচল স্তব্ধ হয়ে গেছে।
সরেজমিনে ঘুরে দেখা গেছে, আনোয়ারার চাতরী পাঁচসিকদার সড়কটি বর্তমানে পানির নিচে তলিয়ে আছে। সবচেয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে দেয়াঙ পাহাড়ের পাদদেশে। পাহাড় থেকে নেমে আসা ঢলের তীব্রতায় কোরিয়ান ইপিজেড (কেইপিজেড) সংলগ্ন ঐতিহ্যবাহী মেরিন অ্যাকাডেমি সড়কটি ভেঙে গেছে। ফলে ওই গুরুত্বপূর্ণ সড়কে সব ধরনের যানবাহন চলাচল পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে। এ ছাড়া গ্রামীণ সড়কগুলো কোথাও হাঁটু আবার কোথাও কোমরসমান পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় অনেক এলাকা উপজেলা সদর থেকে কার্যত বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে।
যোগাযোগ ব্যবস্থার পাশাপাশি গত সোমবার রাত ১২টা থেকে আনোয়ারায় বিদ্যুৎ সরবরাহ সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে। চট্টগ্রাম পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-১-এর আনোয়ারা জোনাল কার্যালয় জানিয়েছে, বৈরী আবহাওয়ার কারণে শাহমীরপুর এলাকায় ৩৩ কেভির (৩৩ হাজার ভোল্ট) প্রধান বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইনের খুঁটি ভেঙে পড়েছে। এ ছাড়া উপজেলার বিভিন্ন স্থানে আরও বেশ কিছু খুঁটি ভেঙে গেছে এবং গাছ পড়ে ছিঁড়ে গেছে বিপুল পরিমাণ তার। ফলে গত তিন দিন ধরে উপজেলার ৯০ হাজারের বেশি গ্রাহক চরম অন্ধকারে দিন কাটাচ্ছেন।
দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় মোবাইল নেটওয়ার্কও অচল হয়ে পড়েছে। উপজেলার এটিএম বুথ এবং বিকাশসহ সব ধরনের মোবাইল ব্যাংকিং সেবা বন্ধ থাকায় মানুষের পকেটে নগদ টাকার তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। বাসাবাড়ির ফ্রিজে রাখা সমস্ত খাবার নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।
সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছে এইচএসসি ও আলিম পরীক্ষার্থীরা। বারশত ইউনিয়নের পরীক্ষার্থী রবিউল আলম জানায়, বিদ্যুৎ না থাকায় মোমবাতি জ্বালিয়েও তারা পরীক্ষার প্রস্তুতি নিতে পারছে না। অন্ধকারে এবং বিশুদ্ধ পানির অভাবে রোগাক্রান্ত ব্যক্তি, শিশু ও বয়োবৃদ্ধদের অবস্থা এখন ওষ্ঠাগত।
প্রতিবছর বর্ষা মৌসুমে একই ধরনের সংকট তৈরি হলেও প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিদের পক্ষ থেকে কোনো স্থায়ী বা কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ না করায় স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
চাতরী চৌমুহনী বাজারের আশপাশের গ্রামবাসী জানান, বছরের পর বছর তারা জলাবদ্ধতার শিকার হলেও কান্দুরিয়া খালটি পুনঃখনন বা দখলমুক্ত করার কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। উল্টো খালের টানেল মোড় থেকে সিকদার হাট পর্যন্ত অংশটি স্থানীয় প্রভাবশালীরা কেটে নিজেদের জমির সঙ্গে মিলিয়ে ফেললেও প্রশাসন নীরব ভূমিকা পালন করছে।
ক্ষোভ প্রকাশ করে আনোয়ারা উপজেলা জামায়াতে ইসলামীর সাংগঠনিক সম্পাদক সাইয়েদ আতিক জামালী বলেন, "আনোয়ারা, বিশেষ করে পশ্চিম আনোয়ারা অঞ্চলটি সবসময় চরম অবহেলিত। সামান্য বৃষ্টি হলেই এখানে বিদ্যুৎ থাকে না। পল্লী বিদ্যুৎ অফিসের কর্মকর্তারা দায়িত্বহীন আচরণের কারণে সাধারণ মানুষকে কষ্ট পোহাতে হয়। এলাকায় নেতার অভাব নেই, কিন্তু জনসাধারণের সমস্যা সমাধানে কোনো অভিভাবক নেই।"
সরেজমিনে বিভিন্ন এলাকা ঘুরে পরিস্থিতির ভয়াবহতা দেখা গেছে। বৈরাগ ইউনিয়নের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের আমুর পাড়ায় অভূতপূর্ব জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে, এমনকি স্থানীয় মসজিদের ভেতরেও পানি ঢুকে পড়েছে। কোরিয়ান ইপিজেডের পানি নিষ্কাশনের জন্য পর্যাপ্ত নালা বা ড্রেন না থাকায় আমানউল্লাহ পাড়া, হুন্দীপ পাড়া, কুলাল পাড়া ও খলিফা পাড়াসহ বিস্তীর্ণ এলাকার ঘরবাড়ি পানির নিচে তলিয়ে গেছে।
অন্যদিকে, আনোয়ারার কৈখাইন নয়া রাস্তা স্লুইসগেটের পানি চলাচলের দরজাগুলো বন্ধ থাকায় ডুমুরিয়া, রুদুরা, কেঁয়াগড়, পশ্চিম কন্যারা ও সিংহরাসহ উপজেলা সদরের প্রায় ২০ হাজার মানুষ নতুন করে কৃত্রিম বন্যার কবলে পড়েছেন।
বৈরাগ ইউনিয়নের বাসিন্দা নুরুন্নবী (৪৫) জানান, "তিন দিন ধরে ঘরে-উঠানে পানি। চার্জার লাইটের চার্জও শেষ। চরম ভোগান্তিতে আছি।" এ ছাড়া দেয়াঙ পাহাড়ের পাদদেশে বসবাসরত বাসিন্দারা এখন যেকোনো মুহূর্তে ভয়াবহ পাহাড়ধসের আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন।
পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে মাঠপর্যায়ে কাজ চলছে দাবি করে আনোয়ারা জোনাল অফিসের ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার (ডিজিএম) মোর্শেদুল আলম এবং ভারপ্রাপ্ত উপ-মহাব্যবস্থাপক মাহবুবুর রহমান বলেন, "টানা বৃষ্টি ও ঝড়ো হাওয়ায় বৈদ্যুতিক লাইনের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। আমাদের টেকনিশিয়ান ও লাইনম্যানরা কাজ করছেন। তবে অতি বর্ষণ ও চারদিকের জলাবদ্ধতার কারণে খুঁটি স্থাপন ও তার সংস্কারের কাজ ব্যাহত হচ্ছে, যার ফলে সংযোগ পুরোপুরি সচল করতে আরও কয়েক দিন সময় লেগে যেতে পারে।"
সার্বিক দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা প্রসঙ্গে আনোয়ারা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. মহিন উদ্দিন বলেন, "পরিস্থিতি সার্বক্ষণিকভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। উপজেলার সবকটি সাইক্লোন সেন্টার ও আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে। পাহাড়ের পাদদেশে ঝুঁকিপূর্ণ বাসিন্দাদের বিষয়ে আমরা সতর্ক আছি এবং প্রয়োজন হওয়া মাত্রই ক্ষতিগ্রস্ত মানুষকে দ্রুত নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নেওয়া হবে।"