চট্টগ্রামে ৪২ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ বৃষ্টি!
১৯৮৩ সালের ৪ আগস্ট চট্টগ্রামে ২৪ ঘণ্টায় সর্বোচ্চ ৫১১ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করার পর গতকালের বৃষ্টিপাতই গত ৪২ বছরে সর্বোচ্চ।
ফটো: সংগৃহীত
চট্টগ্রাম নগরীতে গত ৪২ বছরের রেকর্ড ভাঙা বৃষ্টিতে নজিরবিহীন বিপর্যয় নেমে এসেছে এবং এতে পাহাড় ধস, প্রাণহানি ও জলাবদ্ধতায় স্থবির হয়ে পড়েছে সাধারণ জনজীবন।
গত মঙ্গলবার বিকেল ৩টা পর্যন্ত পূর্ববর্তী ২৪ ঘণ্টায় ৪১২ দশমিক ৩ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করেছে আবহাওয়া অফিস, যা ১৯৮৩ সালের পর একদিনে সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাতের রেকর্ড। এই অভূতপূর্ব অতিবর্ষণ ও সাগরের জোয়ারের পানি একীভূত হয়ে তলিয়ে গেছে নগরীর সিংহভাগ এলাকা, যার ফলে রেললাইন ডুবে যাওয়া, ফ্লাইট বিঘ্নিত হওয়া এবং বন্দর ও বিদ্যুৎ সেবা ব্যাহত হওয়ায় চরম এক দুর্বিষহ দিন পার করেছেন নগরবাসী।
আবহাওয়া অফিসের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৮৩ সালের ৪ আগস্ট চট্টগ্রামে ২৪ ঘণ্টায় সর্বোচ্চ ৫১১ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করার পর গতকালের বৃষ্টিপাতই গত ৪২ বছরে সর্বোচ্চ। এর মাঝে ২০০৭ সালের ১১ জুন ৪০৮ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড হয়েছিল। তবে জুলাই মাসের হিসাব ধরলে এটি গত ৪৩ বছরের মধ্যে জুলাই মাসের সর্বোচ্চ রেকর্ড বৃষ্টি, কারণ এর আগে ১৯৮৩ সালের জুলাই মাসে ৪০৭ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছিল।
পতেঙ্গা আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে, গতকাল রাত ৯টা পর্যন্ত পূর্ববর্তী ২৪ ঘণ্টায় ৩৬৪ দশমিক ৫ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয় এবং সন্ধ্যা ৬টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত ৩ ঘণ্টায় আরও ৩০ দশমিক ৬ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়।
সোমবার দিবাগত মধ্যরাত থেকে শুরু হওয়া অতি ভারী বৃষ্টির সঙ্গে দুপুর পৌনে ১২টার দিকে শুরু হওয়া সাগরের জোয়ারের পানি যোগ হলে পুরো নগরী এক বিশাল ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয় এবং এমন অনেক নতুন এলাকাও এবার পানির নিচে তলিয়ে গেছে যেখানে আগে কখনো পানি উঠেনি।
শহরের অনেক এলাকা হাঁটু থেকে কোমর সমান পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় হালিশহর, পতেঙ্গা, আগ্রাবাদ বাণিজ্যিক এলাকা, কাস্টম হাউজ প্রাঙ্গণ, কাতালগঞ্জ, পাঁচলাইশ, চান্দগাঁও আবাসিক এলাকা, মুরাদপুর-বহদ্দারহাট সড়ক, সিঅ্যান্ডবি, চকবাজার, কাপাসগোলা, জামালখান, রহমতগঞ্জ ও ষোলশহরসহ বিভিন্ন জায়গায় জলাবদ্ধতার তীব্র দুর্ভোগ দেখা দেয়।
এছাড়া পোর্ট কানেক্টিং রোডের হালিশহর আবাসিক থেকে নয়া বাজার অংশ এবং হাটহাজারী-অক্সিজেন রোডের বড়দিঘির পাড় এলাকা কোমর সমান পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় যান চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়।
রেকর্ড বৃষ্টির প্রভাবে চট্টগ্রামের সব ধরনের যোগাযোগ ও অর্থনৈতিক চালিকাশক্তি কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছিল, যার মধ্যে রেললাইন পানিতে ডুবে যাওয়ায় চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রুটে ট্রেন চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায় এবং যাত্রীরা মাঝপথে আটকে পড়েন।
বৈরী আবহাওয়া ও তীব্র বাতাসের কারণে শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ৩টি দূরপাল্লার ফ্লাইট অবতরণ করতে না পেরে ফিরে যায় এবং বেশ কিছু ফ্লাইটের উড্ডয়ন-অবতরণ বিলম্বিত হয়। পাশাপাশি সমুদ্র উত্তাল থাকায় চট্টগ্রাম বন্দরের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হয়েছে এবং পতেঙ্গা এলাকায় একটি গুরুত্বপূর্ণ বাইপাস সড়কের একাংশ ধসে পড়েছে।
এছাড়া টাইগারপাস, উত্তর কাট্টলী ও আসকারদিঘি পাড়ে বড় বড় গাছ ভেঙে সড়কে পড়ায় যান চলাচল সাময়িক বাধাগ্রস্ত হয় এবং বৈদ্যুতিক তার ছিঁড়ে যাওয়া ও ট্রান্সফরমার নষ্ট হওয়ায় নগরীর বিস্তূর্ণ এলাকা দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎহীন থাকে।
এই প্রাকৃতিক দুর্যোগে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছেন সকালে কর্মস্থলমুখী সাধারণ মানুষ, স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী এবং দিনমজুরেরা, যাদের কাছ থেকে গণপরিবহনগুলো দিনভর অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করেছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
অন্যদিকে রেয়াজউদ্দীন বাজারের শত শত দোকানে পানি ঢুকে কোটি কোটি টাকার কাপড় ও ডিপার্টমেন্টাল সামগ্রী নষ্ট হয়ে যাওয়ায় ব্যবসায়ীরা চরম আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন।
নগরের জলাবদ্ধতা নিরসনে বর্তমানে প্রায় ১৪ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে ৪টি মেগা প্রকল্পের কাজ শেষ পর্যায়ে থাকার পরও এমন নজিরবিহীন ডুবন্ত পরিস্থিতি তৈরি হওয়ায় নগরবাসীর মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
অবশ্য প্রকল্প সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা এই ক্ষোভের মুখে নিজেদের পক্ষে সাফাই গেয়ে দাবি করেছেন যে, গত তিন দিনে চট্টগ্রামে রেকর্ড ৫৪৬ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে যা ছিল সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিত এবং ভারী বৃষ্টির সময় সাগরে জোয়ার থাকায় পানি নামতে না পারলেও বৃষ্টি থামার এক থেকে দেড় ঘণ্টার মধ্যে অধিকাংশ এলাকার পানি নেমে গেছে।
চট্টগ্রামের এই দুর্যোগপূর্ণ পরিস্থিতি এখনই কাটছে না জানিয়ে আবহাওয়া অধিদপ্তরের সর্বশেষ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, সক্রিয় মৌসুমী বায়ুর প্রভাবে পরবর্তী ৪৮ ঘণ্টায় চট্টগ্রাম, খুলনা, বরিশাল ও সিলেট বিভাগের কোথাও কোথাও ভারী থেকে অতি ভারী বর্ষণ হতে পারে।
অতি ভারী বৃষ্টির কারণে চট্টগ্রাম মহানগরীর নিচু এলাকায় অস্থায়ী জলাবদ্ধতার পাশাপাশি পার্বত্য এলাকায় ভয়াবহ ভূমি ধস বা পাহাড় ধসের সতর্কতা জারি করা হয়েছে। এই কারণে চট্টগ্রাম সমুদ্র বন্দরকে ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্কতা সংকেত এবং নদী বন্দরকে ২ নম্বর নৌ সতর্কতা সংকেত দেখিয়ে যেতে বলা হয়েছে।