আনোয়ারার কৃতিব্যক্তিত্বঃ বীর মুক্তিযোদ্ধা ও সমাজসেবক কিরীটি ভূষণ দাশগুপ্ত
কিরীটি ভূষণ দাশগুপ্ত | ফটো: সংগৃহীত
একটি অঞ্চলের মানচিত্র বদলে যায় কিছু নিঃস্বার্থ মানুষের হাত ধরে। চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলার সমাজসেবা, শিক্ষা বিস্তার এবং মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে তেমনই এক অবিস্মরণীয় ও প্রাতঃস্মরণীয় নাম কিরীটি ভূষণ দাশগুপ্ত।
আজীবন দেশ ও মানুষের কল্যাণে নিয়োজিত এই গুণী ব্যক্তিত্বকে আজও আনোয়ারাবাসী গভীর শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করে। ১৯৩৫ সালের ১৬ জুলাই আনোয়ারা উপজেলার গুজরা গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন এই কর্মবীর। তাঁর পিতা হেমেন্দ্রলাল দাশগুপ্ত এবং মাতা লাবণ্য প্রভা দাশগুপ্ত।
কিরীটি ভূষণ দাশগুপ্তের শিক্ষাজীবনের সূচনা ঘটে পাটনীকোঠা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। প্রাথমিক শিক্ষার গণ্ডি পেরিয়ে তিনি ভর্তি হন গুজরা নিত্যানন্দ উচ্চ বিদ্যালয়ে, যেখান থেকে ১৯৭৩ সালে কৃতিত্বের সাথে ম্যাট্রিকুলেশন (বর্তমান এসএসসি) পাস করেন। এরপর উচ্চ শিক্ষার স্বপ্ন নিয়ে তিনি পা রাখেন ঐতিহ্যবাহী চট্টগ্রাম সরকারি কলেজে। তবে নিয়তির পরিহাসে, পারিবারিক আর্থিক অসচ্ছলতার কারণে তাঁর উচ্চ শিক্ষার পথ বাধাগ্রস্ত হয়। প্রবল ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও বাধ্য হয়ে তাঁকে ফিরে যেতে হয় কর্মজীবনে। ১৯৫৮ সালের শুরুতে একটি বেসরকারি কোম্পানিতে যোগদানের মাধ্যমে শুরু হয় তাঁর নতুন এক সংগ্রাম।
চাকরি জীবন শুরু করলেও দেশের তৎকালীন রাজনৈতিক সংকট ও পরাধীনতার গ্লানি কিরীটি বাবুকে স্থির থাকতে দেয়নি। ৬০-এর দশকের আইয়ুব বিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে '৬৯-এর ঐতিহাসিক গণআন্দোলনে তিনি সক্রিয় ও অগ্রগামী ভূমিকা পালন করেন। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে তাঁর অবদান ছিল অনন্য। আনোয়ারার বিশাল মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্পটি ছিল তাঁরই নিজ গ্রামের চৈতন্য মহাজনের বাড়িতে। এই ক্যাম্পটি পরিচালনায় তিনি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ও গুরুত্বপূর্ণ সাংগঠনিক দায়িত্ব পালন করেন। দীর্ঘ নয় মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর দেশ স্বাধীন হলে, একদিকে নিজের চাকরি এবং অন্যদিকে যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ পুনর্গঠনে তিনি ঝাঁপিয়ে পড়েন।
"যাঁরা নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে দেশের স্বাধীনতা এবং মানুষের কল্যাণে কাজ করেন, ইতিহাস তাঁদের স্থান দেয় অনন্য উচ্চতায়।"
জনগণের প্রতি গভীর ভালোবাসা থেকে ১৯৭৩ সালের ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে এলাকার মানুষের বিশেষ আহ্বানে সাড়া দিয়ে তিনি হাইলধর ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য (মেম্বার) পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন এবং বিপুল ভোটে জয়লাভ করেন। ১৯৭৩ থেকে ১৯৮৩ সাল পর্যন্ত টানা দুই মেয়াদে ১০ বছর তিনি হাইলধর ইউনিয়নের নির্বাচিত সদস্য হিসেবে নিষ্ঠার সাথে দায়িত্ব পালন করেন।এই দীর্ঘ সময়ে তিনি বিভিন্ন মেয়াদে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বও অত্যন্ত দক্ষতার সাথে সামলান এবং ইউনিয়নের বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডে নিজের দূরদর্শিতার স্বাক্ষর রাখেন।
সমাজকর্মের পাশাপাশি এলাকার ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সুশিক্ষায় শিক্ষিত করতে কিরীটি ভূষণ দাশগুপ্ত ছিলেন বদ্ধপরিকর। তিনি দীর্ঘদিন নিজের প্রাক্তন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গুজরা নিত্যানন্দ উচ্চ বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটির সদস্য হিসেবে অবদান রাখেন। এছাড়াও পর পর দুই মেয়াদে দীর্ঘ ৬ বছর আনোয়ারা কলেজ পরিচালনা পরিষদের সদস্য এবং চট্টগ্রাম মহানগরীর ঐতিহ্যবাহী কৃষ্ণকুমারী উচ্চ বিদ্যালয় পরিচালনা পরিষদের সদস্য হিসেবে অত্যন্ত সুনামের সাথে দায়িত্ব পালন করেন।
ব্যক্তিজীবনে অত্যন্ত উদার, অসাম্প্রদায়িক ও পরোপকারী কিরীটি ভূষণ দাশগুপ্ত বিভিন্ন ধর্মীয় ও সামাজিক সংগঠনের সাথে ওতপ্রোতভাবে যুক্ত ছিলেন। তিনি চট্টগ্রাম রামকৃষ্ণ সেবাশ্রম এবং জন্মাষ্টমী উদযাপন ও প্রবর্তক সংঘ (বাংলাদেশ)-এর আজীবন সদস্য হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। পাশাপাশি তিনি বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ ও সীতাকুণ্ড রামকৃষ্ণ সেবাশ্রমের সক্রিয় সদস্য এবং কেন্দ্রীয় পূজা উদযাপন পরিষদের সম্মানিত উপদেষ্টা হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।
সমাজ ও ধর্মীয় চেতনার কল্যাণে নিবেদিতপ্রাণ এই মানুষটির বাংলাদেশের বিভিন্ন রামকৃষ্ণ সেবাশ্রম, মন্দির নির্মাণ ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অসামান্য আর্থিক সহযোগিতা এবং শ্রমের অনন্য অবদান রয়েছে।
নিঃস্বার্থ সমাজসেবা এবং দেশপ্রেমের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত কিরীটি ভূষণ দাশগুপ্ত। একজন প্রকৃত কর্মবীরের কর্ম কখনো হারিয়ে যায় না। আর তাই এই মহান ব্যক্তিত্বের গৌরবময় জীবনী আঞ্চলিক ইতিহাস গ্রন্থ ‘দেয়াঙ পরগণার ইতিহাস (আধুনিক কাল)’-এ বিশেষভাবে লিপিবদ্ধ রয়েছে। আনোয়ারার মাটি ও মানুষের হৃদয়ে তিনি বেঁচে থাকবেন তাঁর কর্মের মাধ্যমে, প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে।