অলীকুল শিরোমণি হযরত শাহ্ মোহছেন আউলিয়া (রহ.) এর জীবন ও ইতিহাস
শাহ মোহছেন আউলিয়ার মাজার, আনোয়ারা | ফটো: রহিম সৈকত/উইকিমিডিয়া
বাংলাদেশের আধ্যাত্মিক ইতিহাসে সুফি সাধক ও আউলিয়াদের অবদান অনস্বীকার্য, যাঁদের পবিত্র স্পর্শে এই অঞ্চল ইসলামের আলোয় উদ্ভাসিত হয়েছিল। এই পুণ্যভূমিতে আগত সাধকদের মধ্যে চট্টগ্রামের ‘বার আউলিয়া’র নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য এবং তাঁদের অন্যতম প্রধান ও উজ্জ্বল নক্ষত্র ছিলেন সৈয়দুল আউলিয়া, অলীকুল শিরোমণি হযরত শাহ্ সূফী মোহছেন আউলিয়া (রহ.) ।
বর্তমানে চট্টগ্রাম শহর থেকে প্রায় ২৫ কিলোমিটার দূরে আনোয়ারা উপজেলার রুস্তমহাট সংলগ্ন বটতলী গ্রামে এই মহান সাধকের পবিত্র মাজার শরীফ অবস্থিত, যা প্রতিদিন হাজারো ভক্ত ও ধর্মপ্রাণ মানুষের মিলনমেলায় পরিণত হয়।
হযরত শাহ্ মোহছেন আউলিয়া (রহ.)-এর জীবনের আদিবৃত্তান্ত নিয়ে সুনির্দিষ্ট ঐতিহাসিক দলিল না পাওয়া গেলেও বিভিন্ন জনশ্রুতি, প্রচলিত প্রবাদ এবং গবেষণালব্ধ তথ্য থেকে তাঁর জীবনীর এক গৌরবময় অধ্যায় জানা যায়।
তিনি সুদূর ইয়েমেনের এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন এবং পিতার তত্ত্বাবধানেই তাঁর প্রাথমিক শিক্ষার হাতেখড়ি হয়। পরবর্তীতে প্রাতিষ্ঠানিক ইসলামী শিক্ষা সমাপ্ত করে তিনি তাসাউফ বা আধ্যাত্মিক জ্ঞানের গূঢ় রহস্য আয়ত্ত করেন।
পরিণত বয়সে আধ্যাত্মিক উৎকর্ষতা অর্জনের পর তিনি তাঁর মামা চট্টগ্রাম শহর আবাদকারী প্রখ্যাত পীরে কামেল হযরত শাহ সূফী সৈয়দ বদর শাহ্ (রহ.)-এর সাথে দিল্লী আসেন এবং কিছুকাল অবস্থানের পর তৎকালীন বাংলার শিক্ষা ও সংস্কৃতির কেন্দ্রবিন্দু ঐতিহাসিক গৌড় রাজ্যে আগমন করেন।
ইসলাম প্রচারের মহান ব্রত নিয়ে হযরত বদর শাহ্ (রহ.) এবং হযরত মোহছেন আউলিয়া (রহ.) আনোয়ারা উপজেলার গহিরা গ্রামের পশ্চিমে বঙ্গোপসাগরের তীরে অবস্থিত ইছাখালী গ্রামের কড়ির হাট বন্দরে অবতরণ করেন।
লোকমুখে বহুল প্রচলিত রয়েছে যে, হযরত মোহছেন আউলিয়া (রহ.) কোনো জলযান ছাড়াই অলৌকিক উপায়ে একটি পাথরকে বাহন বানিয়ে সমুদ্রপথ পাড়ি দিয়ে চট্টগ্রামে এসেছিলেন।
সেখানে অবস্থানকালে তাঁর আধ্যাত্মিক শক্তি ও অনুপম চারিত্রিক গুণাবলীতে মুগ্ধ হয়ে দলে দলে মানুষ ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে এবং সেখানেই প্রথম বার আউলিয়া আস্তানা গড়ে উঠে, যা কালক্রমে সমুদ্রগর্ভে বিলীন হয়ে যায়।
এরপর মামা-ভাগিনা বর্তমান চট্টগ্রাম মূল শহরে এলেও হযরত মোহছেন আউলিয়া (রহ.) পুনরায় আনোয়ারায় ফিরে যান এবং শঙ্খ নদীর উপকূলে ঝিউরী গ্রামে স্থায়ী আস্তানা গড়ে তুলে ইসলাম ধর্মের ব্যাপক প্রসার ঘটান।
এই মহান সাধকের জীবনজুড়ে অসংখ্য অলৌকিক ঘটনার বিবরণ পাওয়া যায়, যা আজও দক্ষিণ চট্টগ্রামের মানুষের মুখে মুখে কথিত আছে। একদিন এক নদীর তীরে বোবা রাখাল ছেলেকে দেখে বাবাজান তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিলে সে অলৌকিকভাবে নিজের বাকশক্তি ফিরে পায় এবং এই ঘটনায় চারদিকে তাঁর খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে।
অন্য এক ঘটনায়, ঝিউরী গ্রামের এক গোয়ালিনীর ছেলে আস্তানায় দুধ নিয়ে আসার পথে হোঁচট খেয়ে পড়ে গেলে সব দুধ মাটিতে শুষে যায়। ছেলেটির কান্না দেখে শাহ্ মোহছেন আউলিয়া (রহ.) মাটিতে চিবিয়ে সমস্ত দুধ পুনরায় বের করে অক্ষত কলসি পূর্ণ করে দেন।
এছাড়া একবার চট্টগ্রামে তীব্র অনাবৃষ্টির কারণে হাহাকার পড়লে তাঁর নেতৃত্বে বিশেষ নামায ও মোনাজাতের পর পরই মুষলধারে বৃষ্টি শুরু হয়, যা থেকে লোকবিশ্বাসের সৃষ্টি হয় যে এখনও আষাঢ় মাসে এই অঞ্চলে বেশি বৃষ্টিপাত হয়।
এই শ্রেষ্ঠ ধর্ম প্রচারক ও আধ্যাত্মিক পুরুষ দীর্ঘ ৯৯ বছর বয়সে ৬ আষাঢ় ইন্তেকাল করেন এবং তাঁকে শঙ্খ নদীর পাড়ে ঝিউরী গ্রামেই সমাহিত করা হয়েছিল। কালের বিবর্তনে এবং নদীভাঙনের কারণে পুরোনো মাজার শরীফটি সংস্কার করা অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়ায় মাজারের বর্তমান মোতোয়াল্লী ও খাদেমদের অনুরোধে এক অনন্য দানবীর এগিয়ে আসেন।
চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের সাবেক মেয়র আলহাজ্ব মোহাম্মদ মনজুর আলম তাঁর নিজস্ব অর্থায়নে এবং হোছনে আরা মনজুর ওয়েলফেয়ার ট্রাস্টের ব্যবস্থাপনায় সম্পূর্ণ নতুন আঙ্গিকে এবং সুবৃহৎ পরিসরে মাজার শরীফটি পুনঃনির্মাণ করেন। বর্তমানে এটি আধুনিক ও দৃষ্টিনন্দন
স্থাপত্যশৈলীর এক অনন্য নিদর্শন হিসেবে দূর-দূরান্ত থেকে আসা দর্শনার্থীদের প্রতিনিয়ত মুগ্ধ করছে।