পরীক্ষার টেবিলে আর ফেরা হলো না হান্নানেরঃ ১১ হাজার ভোল্টের তারে ঝরে গেল তাজা প্রাণ
আব্দুল হান্নান শাহ্ আনোয়ারা সরকারি কলেজের ডিগ্রি প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী। তবে শুধু একজন শিক্ষার্থীই নন, তিনি ছিলেন আব্দুল গফ্ফার শাহ্’র একমাত্র ছেলে।
নিহত আবদুল হান্নান শাহ | ফটো: সংগৃহীত
সকালে ঘুম থেকে উঠে হয়তো এক চিলতে রোদ দেখেছিলেন ২২ বছরের তরুণ আব্দুল হান্নান শাহ্। ডিগ্রি প্রথম বর্ষের ইনকোর্স পরীক্ষা চলছে, তবে আজ বৃহস্পতিবার (১১ জুন) টেবিলজুড়ে বইয়ের পাতা উল্টানোর তাড়া ছিল না; কারণ আজ কোনো পরীক্ষা ছিল না তার।
এই অবসরে বাড়ির পাশের একটা পরিত্যক্ত সুপারি গাছ কেটে সরিয়ে দিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু কে জানত, সেই সুপারি গাছটি কাটার কয়েক মুহূর্তের ব্যবধানই তার জীবনের শেষ মুহূর্ত হয়ে দাঁড়াবে!
বৃহস্পতিবার দুপুরে চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলার বৈরাগ ইউনিয়নের গুয়াপঞ্চক গ্রামে যখন পল্লী বিদ্যুতের ১১ হাজার ভোল্টের উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন তারের স্পর্শে মুহূর্তেই একটি তাজা প্রাণ নিভে গেল, তখন স্তব্ধ হয়ে গেছে পুরো এলাকা।
নিহত আব্দুল হান্নান শাহ্ আনোয়ারা সরকারি কলেজের ডিগ্রি প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী। তবে শুধু একজন শিক্ষার্থীই নন, তিনি ছিলেন আব্দুল গফ্ফার শাহ্’র একমাত্র ছেলে। পরিবারের সব স্বপ্ন, সব ভরসা পুঞ্জীভূত ছিল যাকে ঘিরে, এক নিমেষেই সেই স্বপ্নের ক্যানভাসটা যেন চিরতরে মুছে গেল।
পড়াশোনার পাশাপাশি হান্নান থাকতেন তার চাচাতো ভাইয়ের দোকানে। সেখান থেকেই চলত তার স্বপ্ন ছোঁয়ার লড়াই। গত সোমবার (৮ জুন) থেকে পরীক্ষা শুরু হওয়ায় কিছুদিন আগেই কেবল বাড়িতে এসেছিলেন তিনি। বৃহস্পতিবার পরীক্ষার চাপ না থাকায় সকালের দিকে কুড়াল হাতে বাড়ির পাশে যান সেই পরিত্যক্ত সুপারি গাছটি কাটতে।
গাছ কাটার কাজটা প্রায় শেষ হয়ে এসেছিল। কিন্তু ঠিক তখনই ঘটে যায় সেই মর্মান্তিক ঘটনা। গাছটি ভেঙে পড়ার সময় অসাবধানতাবশত পাশ দিয়ে যাওয়া পল্লী বিদ্যুতের ১১ হাজার ভোল্টের মরণঘাতী লাইনের ওপর গিয়ে পড়ে। গাছের কাঁচা ডালপালা বেয়ে মুহূর্তের মধ্যে হাজার হাজার ভোল্টের বিদ্যুৎ ধেয়ে আসে তরুণের শরীরে।
হঠাৎ তীব্র চিৎকার শুনে প্রতিবেশীরা যখন ছুটে আসেন, ততক্ষণে সব শেষ। রক্তাক্ত ও সংজ্ঞাহীন অবস্থায় হান্নানকে উদ্ধার করে দ্রুত নিয়ে যাওয়া হয় আনোয়ারা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে। কিন্তু চিকিৎসকদের আর কিছু করার ছিল না।
আনোয়ারা উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মাহাতাব উদ্দিন চৌধুরী জানান, হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েছিলেন এই তরুণ। হাসপাতালে আনার পর কেবল আনুষ্ঠানিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে তাকে মৃত ঘোষণা করা হয়।
আজ মাগরিবের নামাজের পর জানাজা শেষে যখন পারিবারিক কবরস্থানে হান্নানকে দাফন করা হলো, তখন হয়তো গুয়াপঞ্চক গ্রামের আকাশজুড়ে ছিল মেঘলা অন্ধকার।
যে ছেলেটি পরীক্ষার ছুটি কাটাতে ভালোবেসে মায়ের কোলে ফিরে এসেছিল, সে আর কোনোদিন বইয়ের পাতা উল্টাবে না, আর কোনোদিন ফিরে যাবে না তার চেনা দোকানে। পেছনে ফেলে গেল শুধু এক বুক হাহাকার আর কখনো না শুকাতে চাওয়া এক পারিবারিক ক্ষত।