আনোয়ারায় স্ত্রীর লাশ হাসপাতালে রেখে পালালেন স্বামী
ছবি বাঁ দিকে স্বামী মারুফ | ফটো: সংগৃহীত
বিয়ের বয়স ছিল মাত্র সাত মাস। গত ডিসেম্বরের এক শীতের রাতে পরিবারের অসম্মতিতে, বা-মায়ের সুরক্ষাকে বিদায় জানিয়ে প্রেমিক মো. মারুফের হাত ধরেছিলেন ১৮ বছরের তরুণী খাদিজা আক্তার কাশফি।
হাইলধর ইউনিয়নের মালঘর বাজার এলাকার কাজী বাড়ির আবদুল জলিলের আদরের ছোট মেয়ে কাশফি হয়তো ভেবেছিলেন, ভালোবাসার এই নতুন আকাশটাই হবে তার চিরকালের আশ্রয়। কিন্তু তাসের ঘরের মতো সেই স্বপ্ন ভেঙে চুরমার হতে সময় লাগল মাত্র কয়েকটা মাস।
বৃহস্পতিবার (১৮ জুন) রাতে আনোয়ারা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের জরুরি বিভাগে যখন কাশফির নিথর দেহটা পড়েছিল, তখন তার সেই ‘ভালোবাসার মানুষ’ মারুফ আর পাশে ছিলেন না; স্ত্রীর লাশটি ফেলে রেখেই তিনি তখন পলাতক।
হাসপাতালের জরুরী বিভাগে এক রহস্যময় শেষ দৃশ্য
বৃহস্পতিবার রাত তখন সাড়ে আটটা। আনোয়ারা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের জরুরি বিভাগের আলো-আঁধারীতে তড়িঘড়ি করে এক তরুণীকে নিয়ে আসেন তার স্বামী মারুফ।
কিন্তু কর্তব্যরত চিকিৎসক ডা. উপমা চৌধুরী পরীক্ষা করেই জানিয়ে দেন, হাসপাতালে আনার আগেই নিভে গেছে এই কিশোরীর জীবনপ্রদীপ।
মৃত্যুর খবরটি শোনার পরপরই যেন পায়ের তলা থেকে মাটি সরে যায় মারুফের। তবে সেই শোক স্ত্রীর জন্য ছিল না, ছিল নিজেকে বাঁচানোর তাগিদ। হাসপাতালের চিকিৎসকদের কিছু বুঝে ওঠার সুযোগ না দিয়েই, কৌশলে ভিড়ের মাঝে মিশে হাসপাতাল থেকে দ্রুত চম্পট দেন ধূর্ত মারুফ।
ডা. উপমা বলেন, “ওই কিশোরীকে মৃত অবস্থায় হাসপাতালে আনা হয়েছিল। নিহতের গলায় একটি স্পষ্ট ও মোটা দাগ রয়েছে। মরদেহ রেখে তার স্বামী যেভাবে তড়িঘড়ি করে হাসপাতাল থেকে সরে পড়েন, তা অত্যন্ত সন্দেহজনক।"
‘ওকে তো আমি নিজের হাতে রেঁধে খাওয়াতাম!’
কাশফির মৃত্যুর খবর যখন কাজী বাড়িতে পৌঁছায়, ততক্ষণে রাতের আকাশ ভারী হয়ে উঠেছে স্বজনদের কান্নায়। তিন ভাই ও চার বোনের মধ্যে সবার ছোট, ঘরের সবচেয়ে আদরের সন্তানকে হারিয়ে নির্বাক মা শাহীনূর আক্তার। বিলাপ করতে করতে তিনি বলছিলেন, “আমার ছোট মেয়েটা বড় আদরের ছিল। পালিয়ে বিয়ে করলেও মায়ের মন তো মানে না। আমি নিজে ওদের বাড়ি গিয়ে রান্না করে দিয়ে আসতাম। মেয়েটা তার স্বামীকে ছাড়া কখনো ভাত পর্যন্ত মুখে তুলত না। সেই স্বামী তাকে এভাবে শেষ করে দিল?”
নিহতের বাবা আবদুল জলিল ও বড় বোন ঝুমুর আক্তারের অভিযোগ, বিয়ের পর থেকেই মারুফ ও তার পরিবার বিভিন্ন অজুহাতে কাশফির ওপর মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন চালাত। বৃহস্পতিবার দুপুরের পর থেকেই কাশফির শ্বশুরবাড়ি থেকে নানা অশুভ ইঙ্গিত আসছিল।
স্বজনদের দাবি, এটি কোনো সাধারণ আত্মহত্যা নয়; কাশফিকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করে এখন আত্মহত্যার নাটক সাজানোর চেষ্টা করছে মারুফ ও তার পরিবার।
খবর পেয়ে আনোয়ারা থানা-পুলিশের একটি দল রাতেই হাসপাতাল থেকে কাশফির মরদেহ উদ্ধার করে। আইনি প্রক্রিয়া শেষে শুক্রবার সকালে লাশ ময়নাতদন্তের জন্য চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে।
আনোয়ারা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. জুনায়েত চৌধুরী জানান, গৃহবধূর গলায় গভীর দাগ পাওয়া গেছে এবং ঘটনার পর থেকেই স্বামী মারুফ পলাতক রয়েছেন। পুলিশ ইতিমধ্যেই ঘটনাটিকে গুরুত্বের সাথে নিয়ে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ শুরু করেছে।
তবে এটি হত্যা নাকি আত্মহত্যা তা ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন (পোস্টমর্টেম রিপোর্ট) হাতে পেলেই পুরোপুরি নিশ্চিত হওয়া যাবে।
আপাতত, লড়াকু এক ভালোবাসার এমন মর্মান্তিক ও নিষ্ঠুর পরিণতি দেখে স্তব্ধ পুরো আনোয়ারা।