পুলিশের রহস্য উদঘাটনঃ ধারের টাকা ও স্ট্যাম্পের জেরে আনোয়ারায় মা-মেয়ে খুন
ধারের টাকা শোধ না করার কুমানসে এবং চুক্তির হলফনামা (স্ট্যাম্প) ছিনিয়ে নেওয়ার উদ্দেশ্যেই এই দ্বৈত হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়েছে। আর এই নৃশংস ঘটনার পেছনে হাত রয়েছে নিহতদেরই এক নিকটাত্মীয়ের।
ঘাতক তেজপ্রিয় বড়ুয়া | ফটো: চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ
আনোয়ারায় সংঘটিত মা-মেয়ে হত্যাকাণ্ডের লোমহর্ষক রহস্য উদ্ঘাটন করেছে পুলিশ। ধারের টাকা শোধ না করার কুমানসে এবং চুক্তির হলফনামা (স্ট্যাম্প) ছিনিয়ে নেওয়ার উদ্দেশ্যেই এই দ্বৈত হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়েছে। আর এই নৃশংস ঘটনার পেছনে হাত রয়েছে নিহতদেরই এক নিকটাত্মীয়ের।
সোমবার (১৫ জুন, ২০২৬) দুপুরে জেলা পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সুপার (এসপি) মো. মাসুদ আলম।

অটোরিকশার ঋণ ও স্ট্যাম্প ছিনতাইয়ের পরিকল্পনা
পুলিশের ভাষ্যমতে, অটোরিকশা কেনার জন্য স্থানীয় সুজন বড়ুয়ার কাছ থেকে ১ লাখ ১৭ হাজার টাকা ধার নিয়েছিলেন তার চাচাতো ভাই রিমন বড়ুয়া ওরফে তেজপ্রিয় বড়ুয়া তেজু। শর্ত ছিল, প্রতি মাসে সুদসহ কিস্তিতে এই টাকা পরিশোধ করতে হবে। এই লেনদেনের প্রমাণ হিসেবে সুজন বড়ুয়ার কাছে একটি লিখিত স্ট্যাম্প সংরক্ষিত ছিল।
নিয়মিত কিস্তি দিতে না পারায় দুই পরিবারের মধ্যে সম্পর্কের অবনতি ঘটে। এসপি মাসুদ আলম জানান, "তেজু পরিকল্পনা করে, কোনোভাবে যদি ওই স্ট্যাম্পটি গায়েব করে দেওয়া যায়, তবে সুজন আর টাকা দাবি করতে পারবে না। দাবি করলেও তেজু বলতে পারবে যে সে টাকা পরিশোধ করে দিয়েছে। এই চিন্তা থেকেই সে সুজনের বাড়িতে হানা দেয়।"
যেভাবে চালানো হয় হত্যাকাণ্ড
পুলিশ জানায়, শনিবার (১৩ জুন) রাত সাড়ে ১০টার দিকে তেজু সুজন বড়ুয়ার বাড়ির পেছনের দরজায় ওত পেতে থাকে। রাত পৌনে ১১টার দিকে সুজনের স্ত্রী এনি বড়ুয়া (৪০) দরজা খুলে বাইরে বের হতে গেলে তেজু তাকে জাপটে ধরে। এনি চিৎকার শুরু করলে তেজু তার কাছে থাকা চাকু দিয়ে তাকে এলোপাতাড়ি আঘাত করে। মায়ের চিৎকার শুনে মেয়ে প্রিয়ন্তী বড়ুয়া (১৬) বাঁচাতে এগিয়ে এলে ঘাতক তেজু তাকেও উপর্যুপরি ছুরিকাঘাত করে এবং এনির মোবাইল ফোনটি নিয়ে পালিয়ে যায়।
পালানোর সময় বাড়ির পেছনের ঝোপঝাড়ের চাকুর ফেলে যায় সে, যা পরবর্তীতে পুলিশ উদ্ধার করে। ঘটনার সময় সুজন বড়ুয়ার পাঁচ বছর বয়সী ছোট সন্তানটি ধস্তাধস্তির মধ্যে সামান্য আঘাত পায়।
মৃত্যুর আগে খুনির নাম বলে যান এনি
হত্যাকাণ্ডের পর প্রতিবেশীরা যখন দ্রুত ওই বাড়িতে পৌঁছায়, তখনো এনি বড়ুয়া জীবিত ছিলেন। তখন উপস্থিত একজন একটি ভিডিও রেকর্ড করেন, যেখানে এনি আঞ্চলিক উচ্চারণে অস্পষ্টভাবে খুনির নাম বলে যান। প্রতিবেশীরা সেই নাম শনাক্ত করার পর পুলিশ জানতে পারে অভিযুক্ত তেজু পলাতক।
গ্রেপ্তার ও বর্তমান পরিস্থিতি
ঘটনার পর চন্দনাইশসহ বিভিন্ন এলাকায় আত্মগোপন করে থাকা তেজুকে রোববার রাতে পটিয়া থেকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। গ্রেপ্তার এড়াতে সে পটিয়ায় রেললাইনের পাশে এনির মোবাইলটি ফেলে দিয়েছিল।
পুলিশ জানিয়েছে, তেজু স্থানীয়ভাবে অপরাধপ্রবণ ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত এবং সে স্থানীয় ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ছিল। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তেজু স্বীকার করেছে যে তার উদ্দেশ্য খুন করা ছিল না, কেবল ভয় দেখিয়ে স্ট্যাম্প ছিনতাইয়ের উদ্দেশ্যে সে এসেছিল।
এই ঘটনায় নিহত এনি বড়ুয়ার স্বামী সুজন বড়ুয়া বাদী হয়ে রোববার রাতে আনোয়ারা থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেছেন। গ্রেপ্তারকৃত তেজপ্রিয় বড়ুয়া তেজুকে আজই (সোমবার) আদালতে সোপর্দ করা হবে বলে জানিয়েছে পুলিশ।