৩৪ হাজার ৪৯৭ কোটি টাকায় নির্মিত হচ্ছে পদ্মা ব্যারাজ
ফটো: বাসস
দেশের নদী ব্যবস্থা পুনরুদ্ধার, লবণাক্ততা নিয়ন্ত্রণ, সেচ সুবিধা সম্প্রসারণ ও পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষায় প্রায় ৩৪ হাজার ৪৯৭ কোটি টাকা ব্যয়ে ‘পদ্মা ব্যারাজ (প্রথম পর্যায়)’ প্রকল্প অনুমোদন দিয়েছে সরকার।
বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ সচিবালয়ে অনুষ্ঠিত জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় প্রকল্পটির অনুমোদন দেওয়া হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন একনেক চেয়ারপারসন ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
পরিকল্পনা কমিশনের সুপারিশের ভিত্তিতে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের অধীন বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে। ২০২৬ সালের জুলাই থেকে ২০৩৩ সালের জুন পর্যন্ত মেয়াদে শতভাগ সরকারি অর্থায়নে এটি বাস্তবায়নের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
একনেক সভা শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে পানিসম্পদ মন্ত্রী মো. শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানী বলেন, দেশের জন্য এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি উদ্যোগ। তার ভাষ্য, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে দেশের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ এলাকা এবং প্রায় ৭ কোটি মানুষ উপকৃত হবে।
পরিকল্পনা কমিশনের তথ্যমতে, খুলনা, ঢাকা, রাজশাহী ও বরিশাল বিভাগের ১৯টি জেলা এই প্রকল্পের আওতায় আসবে। হিসনা-মাথাভাঙ্গা, গড়াই-মধুমতি, চন্দনা-বারাশিয়া, বড়াল ও ইছামতী নদী ব্যবস্থার প্রবাহ ও নাব্যতা পুনরুদ্ধারই হবে প্রকল্পের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য।
এ ছাড়া সাতক্ষীরা, খুলনা ও বাগেরহাট অঞ্চলে লবণাক্ততা কমানো, সুন্দরবনে মিঠাপানির প্রবাহ নিশ্চিত করা, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং যশোরের ভবদহ এলাকার জলাবদ্ধতা নিরসনেও প্রকল্পটি ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে নিষ্কাশন ব্যবস্থার উন্নয়ন, ভূগর্ভস্থ পানির পুনঃসঞ্চয়ন এবং আর্সেনিক দূষণ কমানোর বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
সরকার জানিয়েছে, চলমান গঙ্গা-কপোতাক্ষ (জি-কে) সেচ প্রকল্প এবং প্রস্তাবিত উত্তর রাজশাহী সেচ প্রকল্পকে সহায়তা দিয়ে দক্ষিণ-পশ্চিম, মধ্য-পশ্চিম ও উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে সেচ সুবিধা বাড়ানো হবে। পাশাপাশি কর্মসংস্থান সৃষ্টি, পরিকল্পিত ভূমি উন্নয়ন ও নগরায়ণেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
প্রকল্পের আওতায় ২ দশমিক ১ কিলোমিটার দীর্ঘ মূল পদ্মা ব্যারাজ নির্মাণ করা হবে। এতে থাকবে ৭৮টি স্পিলওয়ে, ১৮টি আন্ডারস্লুইস, দুটি ফিশ পাস, নৌ-লক, গাইড বাঁধ ও অ্যাপ্রোচ বাঁধ। এছাড়া গড়াই, চন্দনা ও হিসনা নদীতে অফটেক স্ট্রাকচার নির্মাণ, গড়াই-মধুমতি নদী ব্যবস্থার ১৩৫ দশমিক ৬০ কিলোমিটার ড্রেজিং এবং হিসনা নদী ব্যবস্থার ২৪৬ দশমিক ৪৬ কিলোমিটার ড্রেনেজ চ্যানেল পুনঃখননের পরিকল্পনা রয়েছে।
এ ছাড়া প্রকল্পের অংশ হিসেবে ১৮০ কিলোমিটার অ্যাফ্লাক্স বাঁধ এবং মোট ১১৩ মেগাওয়াট উৎপাদন ক্ষমতার দুটি জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
সরকারের হিসাব অনুযায়ী, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে জাতীয় জিডিপিতে শূন্য দশমিক ৪৫ শতাংশ অবদান যুক্ত হবে এবং বছরে প্রায় ৮ হাজার কোটি টাকার প্রত্যক্ষ আর্থিক সুবিধা পাওয়া যাবে। একই সঙ্গে বৃহত্তর কুষ্টিয়া, ফরিদপুর, যশোর, খুলনা, বরিশাল, পাবনা ও রাজশাহী অঞ্চলের প্রায় ২৮ লাখ ৮০ হাজার হেক্টর কৃষিজমিতে সেচ সুবিধা নিশ্চিত হবে। পদ্মা নদীতে প্রায় ২ হাজার ৯০০ মিলিয়ন ঘনমিটার পানি সংরক্ষণও সম্ভব হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
প্রকল্পের পটভূমি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ফারাক্কা ব্যারাজ নির্মাণের পর শুষ্ক মৌসুমে পদ্মা-গঙ্গা নদীর পানিপ্রবাহ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। এর প্রভাবে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিম ও উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের অনেক নদী শুকিয়ে যেতে শুরু করে এবং কৃষি, মৎস্য, নৌ-পরিবহন ও পরিবেশব্যবস্থায় নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।
পরিকল্পনা কমিশনের মতে, দক্ষিণাঞ্চলে মিঠাপানির প্রবাহ কমে যাওয়ায় নদী ও খালে লবণাক্ততা বৃদ্ধি পেয়েছে, যা সুন্দরবনসহ জীববৈচিত্র্য ও স্থানীয় মানুষের জীবিকার জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ পরিস্থিতিতে টেকসই জলসম্পদ ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে পদ্মানির্ভর অঞ্চলে দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ গ্রহণ জরুরি হয়ে পড়েছে।