আজ শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ৪৫তম শাহাদাতবার্ষিকী
মেজর জিয়াউর রহমানই চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে স্বাধীনতার ঘোষণা দেন।
শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান | ফটো: সংগৃহীত
আজ ৩০ মে, ২০২৬। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর প্রতিষ্ঠাতা, প্রয়াত রাষ্ট্রপতি এবং বহুদলীয় গণতন্ত্রের প্রবর্তক মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান বীরউত্তমের ৪৫তম শাহাদাৎবার্ষিকী। ১৯৮১ সালের এই দিবাগত রাতে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউজে একদল বিপথগামী সৈনিকের হাতে তিনি নির্মমভাবে শাহাদাৎবরণ করেন। সেই থেকে তাঁর প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক দল বিএনপি প্রতি বছর এই দিনটিকে অত্যন্ত গুরুত্ব ও গভীর শ্রদ্ধার সাথে শাহাদাৎবার্ষিকী হিসেবে পালন করে আসছে।
বর্ণাঢ্য সামরিক ও রাজনৈতিক জীবন
জিয়াউর রহমান তাঁর কর্মময় জীবনের সততা, নিষ্ঠা, গভীর দেশপ্রেম, কঠোর পরিশ্রম এবং নেতৃত্বের দৃঢ়তার কারণে এদেশের গণমানুষের হৃদয়ে স্থায়ী আসন করে নিয়েছেন। ১৯৩৬ সালের ১৯ জানুয়ারি বগুড়ার গাবতলীর বাগবাড়িতে মাতুলালয়ে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। তাঁর পিতা মনসুর রহমান কলকাতায় একজন কেমিস্ট হিসেবে সরকারি চাকরিতে নিয়োজিত ছিলেন। শৈশব ও কৈশোরের একটি সময় গ্রামে কাটানোর পর জিয়াউর রহমান পিতার সঙ্গে কলকাতায় এবং দেশ বিভাগের পর করাচিতে চলে যান।
শিক্ষাজীবন শেষে ১৯৫৩ সালে তিনি পাকিস্তান মিলিটারি একাডেমি কাবুলে অফিসার ক্যাডেট হিসেবে ভর্তি হন এবং ১৯৫৫ সালে কমিশন লাভ করেন। ১৯৬৫ সালের পাক-ভারত যুদ্ধে খেমকারান সেক্টরে অসীম সাহসিকতার সঙ্গে একটি কোম্পানির অধিনায়ক হিসেবে যুদ্ধ পরিচালনা করেন তিনি। তাঁর কোম্পানি ওই যুদ্ধে সবচেয়ে বেশি খেতাব লাভ করেছিল।
১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ পাকিস্তানি বাহিনী যখন এদেশের নিরস্ত্র জনতার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে, তখন তৎকালীন মেজর জিয়াউর রহমানই চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। দীর্ঘ নয় মাসের মুক্তি সংগ্রামে তিনি একটি সেক্টরের অধিনায়ক হিসেবে সমরনায়কের দায়িত্ব পালন করেন এবং বীরত্বের স্বীকৃতিস্বরূপ ‘বীরোত্তম’ খেতাবে ভূষিত হন।
রাষ্ট্র পরিচালনা ও বহুদলীয় গণতন্ত্র
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট শেখ মুজিবুর রহমান নিহত হওয়ার পর এক বিশেষ প্রেক্ষাপটে জিয়াউর রহমান রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ওই বছরের ৩ নভেম্বর ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বে সামরিক অভ্যুত্থানে খন্দকার মোশতাক আহমদ ক্ষমতাচ্যুত হন এবং সেনাবাহিনীর তৎকালীন উপপ্রধান মেজর জেনারেল জিয়াকে গৃহবন্দি করা হয়। চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে চরম বিশৃঙ্খলা। দেশ যখন এক গভীর অনিশ্চয়তার মুখে, ঠিক তখনই ৭ নভেম্বর সিপাহী-জনতার মিলিত বিপ্লবের মাধ্যমে জিয়াউর রহমান মুক্ত হন এবং দেশের নেতৃত্বের হাল ধরেন।
রাষ্ট্রের হাল ধরে তিনি দেশের মানুষের উপযোগী একটি স্বতন্ত্র ‘জাতীয়তাবাদী’ আদর্শের বাস্তবায়ন ঘটান। দেশে ঐক্যের রাজনীতি চালু করে চরম বামপন্থী ও চরম ডানপন্থীদের এক কাতারে নিয়ে আসেন। তিনি দেশে বহুদলীয় গণতন্ত্রের প্রবর্তন করেন এবং বাক ও ব্যক্তি স্বাধীনতা ফিরিয়ে দেন। মাত্র ছয় বছর রাষ্ট্র পরিচালনার সুযোগ পেয়ে তিনি বিশ্ব দরবারে বাংলাদেশকে এক নতুন মর্যাদায় দাঁড় করান এবং দেশকে ‘তলাবিহীন ঝুঁড়ি’র অপবাদ থেকে মুক্ত করেন। বাংলাদেশের সামরিক বাহিনীকে নতুনভাবে ঢেলে সাজানোর কৃতিত্বও তাঁর। মৃত্যুর পর ঢাকার মানিক মিয়া এভিনিউয়ে অনুষ্ঠিত তাঁর স্মরণকালের সর্ববৃহৎ নামাজে জানাজা প্রমাণ করে তিনি সাধারণ মানুষের কাছে কতটা জনপ্রিয় ছিলেন।
শাহাদাৎবার্ষিকীর বিস্তারিত কর্মসূচি
শহীদ জিয়ার ৪৫তম শাহাদাৎবার্ষিকী উপলক্ষ্যে আজ শনিবার (৩০ মে) রাজধানী ঢাকাসহ দেশব্যাপী দিনব্যাপী নানা কর্মসূচি পালন করছে বিএনপি ও এর অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনগুলো। কর্মসূচির অংশ হিসেবে রাজধানীতে শ্রদ্ধা নিবেদন, খাদ্য ও বস্ত্র বিতরণসহ বিভিন্ন মানবিক কার্যক্রমে সরাসরি অংশ নেবেন বিএনপি চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
দলীয় সূত্র অনুযায়ী, আজ শনিবার বেলা ১১টায় রাজধানীর জিয়া উদ্যানে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সমাধিতে পুষ্পস্তবক অর্পণ ও শ্রদ্ধা নিবেদন করবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এ সময় বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্যসহ কেন্দ্রীয় শীর্ষ নেতারা উপস্থিত থাকবেন।
শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে বেলা সাড়ে ১১টায় রাজধানীর মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ের টি অ্যান্ড টি খেলার মাঠ সংলগ্ন এলাকায় দুঃস্থ মানুষের মধ্যে খাদ্যসামগ্রী ও বস্ত্র বিতরণ কার্যক্রমে অংশ নেবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এরপর তিনি ধারাবাহিকভাবে রাজধানীর আরও ১৬টি স্থানে আয়োজিত একই ধরনের সাহায্য বিতরণ কর্মসূচিতে উপস্থিত থাকবেন।
এদিকে, সকাল সাড়ে ৯টায় জিয়াউর রহমান ফাউন্ডেশনের নেতাদের সঙ্গে নিয়ে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সমাধিতে শ্রদ্ধা নিবেদন করবেন বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব ও প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা রুহুল কবির রিজভী। পরে বেলা ১১টায় সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট মাজার সংলগ্ন এলাকায় জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের আয়োজনে দুঃস্থদের মাঝে বিভিন্ন সামগ্রী বিতরণ কর্মসূচিতে অংশ নেবেন তিনি।
অন্যদিকে, বেলা ১১টা ২০ মিনিটে কারওয়ান বাজারে এফডিসির সামনে জাতীয়তাবাদী সামাজিক সাংস্কৃতিক সংস্থা (জাসাস) ও স্থানীয় নেতাকর্মীদের উদ্যোগে আয়োজিত দুঃস্থ ও অসহায় মানুষের মাঝে খাদ্য বিতরণ কর্মসূচিতে অংশ নেবেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আব্দুল মঈন খান।
এছাড়া সারা দেশের জেলা, মহানগর ও উপজেলা পর্যায়েও আলোচনা সভা, মিলাদ মাহফিল ও কাঙালি ভোজের মাধ্যমে দিবসটি পালন করছে দলটির সর্বস্তরের নেতাকর্মীরা।