আনোয়ারায় এক দশকেও শুকায়নি রোয়ানুর ক্ষতঃ ২৮০ কোটির প্রকল্প গিলেছে বিগত সরকারের দুর্নীতি!
দশ বছর ধরে দুর্ভোগের সাগরে ভাসতে থাকা উপকূলবাসীর একটাই দাবি নতুন এই প্রকল্প যেন বিগত আমলের ২৮০ কোটির প্রকল্পের মতো দুর্নীতির পেটে চলে না যায়।
আনোয়ারায় রোয়ানুর আঘাত | ফটো: মোঃ সুমন শাহ
দেখতে দেখতে কেটে গেছে দীর্ঘ একটি দশক। ২০১৬ সালের ২১ মে প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড় ‘রোয়ানু’র তাণ্ডবে লণ্ডভণ্ড হয়ে গিয়েছিল চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপকূল।
আজ এক দশক পরও রায়পুর ও জুঁইদণ্ডী ইউনিয়নের হাজার হাজার মানুষের বুকে সেই রোয়ানুর ক্ষত এখনো দগদগে। বিগত আওয়ামী সরকারের আমলে আনোয়ারা উপকূল রক্ষায় ২৮০ কোটি ৩০ লাখ টাকার একটি মেগা প্রকল্প নেওয়া হলেও, তা আদতে কোনো কাজে আসেনি। প্রশাসনের চরম গাফিলতি এবং তৎকালীন রাঘববোয়ালদের সীমাহীন দুর্নীতির কারণে উপকূলের কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন তো দূরের কথা, অরক্ষিত বেড়িবাঁধের কারণে মানুষের ভাগ্য এখনো আগের মতোই ট্র্যাজিক রয়ে গেছে।
এক দশক আগের সেই ভয়াল স্মৃতির কথা মনে হলে এখনো কেঁপে ওঠেন স্থানীয় বাসিন্দারা। ২০১৬ সালের মে মাসের সেই দিনে জোয়ারের পানির উচ্চতা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে রায়পুর ও জুঁইদণ্ডী ইউনিয়নের অন্তত ১০টি গ্রাম পুরোপুরি সাগরের পানির নিচে তলিয়ে যায়। দুই ইউনিয়নের দুই হাজারেরও বেশি কাঁচা ও আধাপাকা ঘরবাড়ি মুহূর্তের মধ্যে খড়কুটোর মতো ভেসে গিয়েছিল। বেড়িবাঁধ উপচে ও ভেঙে তলিয়ে গিয়েছিল দুই শতাধিক মৎস্য ঘের এবং অসংখ্য ফসলি জমি। পানিবন্দী হয়ে পড়েছিলেন প্রায় ৫০ হাজার মানুষ।
ফকিরহাট এলাকার বাসিন্দা শাহাবুদ্দিনের চোখের সামনেই সেবার ভেসে গিয়েছিল তাঁর একমাত্র সম্বল ওষুধের দোকানটি। আর সপ্তাহখানেক আগে অনেক কষ্টে মাথা গোঁজার ঠাঁই তৈরি করা পোশাককর্মী খালেদার সেই ভাঙা ঘরের পাশে বসে কান্নার ছবি যেন আজ ১০ বছর পরও আনোয়ারার ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের চিরন্তন অভিব্যক্তি।
রোয়ানুর তাণ্ডবের পর উপকূলবাসীকে বাঁচাতে তৎকালীন সরকারের আমলে ২৮০ কোটি ৩০ লাখ টাকার বিশাল বেড়িবাঁধ প্রকল্প অনুমোদন করা হয়েছিল। কিন্তু অভিযোগ রয়েছে, ঠিকাদার ও স্থানীয় প্রভাবশালী রাজনৈতিক সিন্ডিকেটের পকেট ভারী করা ছাড়া এই প্রকল্পের দৃশ্যমান কোনো সুফল মেলেনি। বাঁধের কাজ টেকসই না হওয়ায় এবং ব্লক বসানোর নামে নয়ছয় করায় রায়পুর ইউনিয়নের উত্তর পরুয়াপাড়া থেকে পারকি সমুদ্র সৈকত সংলগ্ন প্রায় ৩ কিলোমিটার এলাকা এখনো সম্পূর্ণ অরক্ষিত অবস্থায় রয়ে গেছে।
বিগত এক দশকে রোয়ানুর পর আম্ফান, ইয়াস, সিত্রাং, মোখা এবং রেমালের মতো একের পর এক আঘাত হানা ঘূর্ণিঝড়ে আনোয়ারার উপকূলীয় অর্থনীতি, মৎস্যচাষ এবং পর্যটন খাত একপ্রকার ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। তবে সম্প্রতি পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) পারকি সৈকত ও টানেল সংযোগ সড়ক রক্ষায় নতুন করে ৫৪৮ কোটি টাকার একটি সংশোধিত মেগা প্রকল্প হাতে নিয়েছে।
দশ বছর ধরে দুর্ভোগের সাগরে ভাসতে থাকা উপকূলবাসীর একটাই দাবি নতুন এই প্রকল্প যেন বিগত আমলের ২৮০ কোটির প্রকল্পের মতো দুর্নীতির পেটে চলে না যায়। এবার যেন কোনো রাজনৈতিক চাটুকারিতা ছাড়াই একটি সম্পূর্ণ টেকসই ও নিশ্ছিদ্র স্থায়ী বেড়িবাঁধ নির্মাণ করা হয়, যা আনোয়ারার লাখো মানুষের জীবন ও স্বপ্নকে সাগরের আগ্রাসন থেকে আজীবনের জন্য সুরক্ষিত রাখবে।