গুজবের ফাঁদে প্রধানমন্ত্রীঃ ভুয়া ফটোকার্ডের তথ্যে সংসদে বিরোধী দলকে টার্গেট
ফটো: দ্য ডিসেন্ট
সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়ানো একটি সম্পূর্ণ ভুয়া ও এডিটেড ফটোকার্ডের বিভ্রান্তিকর তথ্য চলে গেছে দেশের নীতিনির্ধারণী মহলের সর্বোচ্চ পর্যায়ে।
একটি ভুয়া ফেসবুক কার্ডের ওপর ভিত্তি করে খোদ প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বিরোধী দলগুলোর তীব্র সমালোচনা করেছেন।
তবে ফ্যাক্ট-চেকিং ও সংবাদমাধ্যমের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, বিরোধী দলগুলো বাজেটে মদ বা সিগারেটের ট্যাক্স বাড়ানোর বিরুদ্ধে কোনো প্রতিবাদই করেনি; বরং একটি সম্পাদিত (Edited) মিম বা ভুয়া ফটোকার্ড থেকে এই বিভ্রান্তির উৎপত্তি।
শনিবার (১৩ জুন) কক্সবাজার সদরের পিএমখালীতে ‘পাতলী খাল পুনঃখনন’ কার্যক্রমের শুভ উদ্বোধন ও সমাবেশে বক্তব্য দেওয়ার সময় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বিরোধী দলের সমালোচনা করে বলেন, 'যে বাজেটের মাধ্যমে জনগণের জন্য স্বস্তির ব্যবস্থা করছে সরকার, সেই বাজেট বলে বিরোধী দল মানে না। তারা দাবি তুলেছে কেন মদের উপরে আমরা ট্যাক্স বাড়ালাম। তারা দাবি তুলেছে কেন আমরা সিগারেটের উপরে ট্যাক্স বাড়ালাম। এই তাদের দুঃখ।'
প্রধানমন্ত্রীর এই বক্তব্যটি বিএনপির অফিশিয়াল ইউটিউব চ্যানেলসহ দেশের মূলধারার সকল টেলিভিশন ও সংবাদমাধ্যমে (স্টার নিউজ, ইত্তেফাক, কালের কণ্ঠ, ৭১ টিভি, এনটিভি, সময় নিউজ) গুরুত্বের সাথে প্রচারিত হয়।
অনুসন্ধানে যা জানা গেলঃ
প্রধানমন্ত্রীর এই বক্তব্যের সূত্র ধরে অনুসন্ধানে জানা যায়, গত ১১ জুন প্রস্তাবিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট ঘোষণার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে দৈনিক ‘কালের কণ্ঠ’ পত্রিকার আদলে তৈরি একটি ফটোকার্ড ভাইরাল হয়।
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর একটি মিছিলের ছবি ব্যবহার করে তৈরি ওই ভুয়া ফটোকার্ডের শিরোনামে লেখা ছিল, 'বাজেটে বিড়ি, সিগারেট, মদ, গাঁজা ও তামাকজাত দ্রব্যের দাম বৃদ্ধির প্রতিবাদে জামায়াতে ইসলামীর তাৎক্ষণিক বিক্ষোভ মিছিল।'
এমনকি ছবিতে থাকা মিছিলের মূল ব্যানারেও এডিটিংয়ের মাধ্যমে এই একই লাইনটি বসিয়ে দেওয়া হয়েছিল।
কেন এই দাবিটি সম্পূর্ণ মিথ্যা
দৈনিক কালের কণ্ঠ এ ধরনের কোনো ফটোকার্ড বা সংবাদ প্রকাশ করেনি। ১১ জুন তাদের অফিশিয়াল পেজে প্রকাশিত আসল ফটোকার্ডটির শিরোনাম ছিল “প্রস্তাবিত বাজেটের প্রতিবাদে জামায়াতের বিক্ষোভ মিছিল”।
জামায়াতের অফিশিয়াল ফেসবুক পেজ ও ইউটিউব চ্যানেলে থাকা মূল ভিডিও এবং ছবির সাথে ভাইরাল হওয়া ছবির তুলনা করে দেখা গেছে, আসল ব্যানারে লেখা ছিল, “গণবিরোধী ও লুটপাটের বাজেটের প্রতিবাদে বিক্ষোভ মিছিল”। সেখানে মদ, সিগারেট বা গাঁজার কোনো উল্লেখই ছিল না।
রিউমার স্ক্যানারের সত্যতা নিশ্চিতকরণ
দেশের শীর্ষস্থানীয় ফ্যাক্ট-চেকিং সংস্থা ‘রিউমার স্ক্যানার’ ইতিমধ্যেই ১২ জুন এই ফটোকার্ডটিকে সম্পূর্ণ ‘ভুয়া’ বা ‘নকল’ হিসেবে শনাক্ত করে। বাজেট নিয়ে প্রধান বিরোধী দল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী কিংবা জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) কারো অফিশিয়াল বক্তব্যেই মদ-সিগারেটের ট্যাক্স বাড়ানোর প্রতিবাদের কোনো তথ্য নেই। জামায়াতে ইসলামী এই বাজেটকে “অবাস্তবায়নযোগ্য, উচ্চাভিলাষী ও লুটপাটের সহায়ক” এবং “ঋণনির্ভর” বলে আখ্যা দিয়েছে, তামাক বা মদের দাম নিয়ে তারা কোনো ক্ষোভ প্রকাশ করেনি।
ডিজিটাল দুনিয়ার অপপ্রচারের গভীরতা কতখানি, তা এই ঘটনাটি পুনর্বার প্রমাণ করে। একটি সম্পূর্ণ তৈরি করা ও অসত্য ডিজিটাল ফটোকার্ডের তথ্য যাচাই না করেই দেশের প্রধানমন্ত্রী জনসভায় বক্তব্য দিয়েছেন, যা আদতে কোনো রাজনৈতিক দলেরই অফিশিয়াল অবস্থান ছিল না।
সূত্রঃ দ্য ডিসেন্ট