ভাঙন রুখতে পাউবোর মেগা প্ল্যানঃ ৫৪৮ কোটি টাকায় নতুন রূপ পাচ্ছে পারকি সৈকত
প্রকল্পটি পুরোপুরি বাস্তবায়িত হলে শুধু পারকি সৈকতই রক্ষা পাবে না, একই সাথে সুরক্ষিত হবে আশেপাশের বিভিন্ন স্থাপনা।
পারকি সমুদ্র সৈকত | ফটো: সংগৃহিত
সাগরের আগ্রাসী রূপ আর একের পর এক প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড়ের থাবায় অস্তিত্বের সংকটে পড়া দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম ‘পারকি সমুদ্র সৈকত’ রক্ষায় এবার বিশাল মহাপরিকল্পনা হাতে নিয়েছে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)। প্রায় ৫৪৮ কোটি টাকা ব্যয়ে ‘পারকি সি-বিচ সংরক্ষণ’ শীর্ষক একটি মেগা প্রকল্প আলোর মুখ দেখতে যাচ্ছে।
প্রকল্পটি পুরোপুরি বাস্তবায়িত হলে শুধু পারকি সৈকতই রক্ষা পাবে না, একই সাথে সুরক্ষিত হবে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান টানেলের সংযোগ সড়ক, নৌবাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা এবং টানেল সার্ভিস এরিয়াসহ আনোয়ারা উপকূলের সম্পূর্ণ দৃশ্যপট। বর্তমানে নকশা চূড়ান্তকরণ ও সংশোধনী পরিমার্জনের কাজ দ্রুত গতিতে চলছে।
অরক্ষিত ৩ কিলোমিটার এবং সাগরে বিলীন হওয়ার শঙ্কা
জানা যায়, আনোয়ারার প্রায় ১০ কিলোমিটার দীর্ঘ উপকূলীয় এলাকার মধ্যে ৭ কিলোমিটার এলাকা বেড়িবাঁধ ব্লকের মাধ্যমে সুরক্ষিত করা হলেও রায়পুর ইউনিয়নের উত্তর পরুয়াপাড়া থেকে পারকি সৈকত সংলগ্ন প্রায় ৩ কিলোমিটার এলাকা এখনো সম্পূর্ণ অরক্ষিত। ২০২০ সালের আম্ফান থেকে শুরু করে ইয়াস, সিত্রাং, মোখা, রোয়ানু, হামুন এবং সর্বশেষ রেমালের মতো একের পর এক প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড় আর জলোচ্ছ্বাসের আঘাতে এই বিস্তীর্ণ এলাকাটি এখন ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে।
ভাঙনের তীব্রতায় ইতিমধ্যেই সৈকতের ঝাউবাগান ও সবুজ বেষ্টনী সাগরে বিলীন হয়ে গেছে, তলিয়ে গেছে কোটি কোটি টাকার মৎস্য প্রকল্প। সৈকত ভাঙনের কারণে পর্যটকদের আনাগোনা কমে যাওয়ায় স্থানীয় ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরাও পড়েছেন চরম লোকসানে। আসন্ন বর্ষা মৌসুমে বড় কোনো জলোচ্ছ্বাস হলে পুরো পর্যটন এলাকাটি সাগরের বুকে হারিয়ে যাওয়ার শঙ্কা প্রকাশ করছেন স্থানীয়রা।
৫৪৮ কোটির প্রকল্পে যা যা থাকছে
উপকূলের কান্না থামাতে এবং স্থানীয় কৃষি ও পর্যটন খাতকে চাঙ্গা করতে পাউবো চট্টগ্রাম বিভাগ সম্পূর্ণ সরকারি অর্থায়নে ৫৪৮ কোটি ১৯ লাখ ২৬ হাজার টাকার এই প্রকল্পটির নকশা তৈরি করেছে।
মেগা প্রকল্পের আওতায় যেসব কাজ করা হবে
ভূমি অধিগ্রহণ ও উপকূলীয় উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোগত পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে। এর মধ্যে মোট ৩০ দশমিক ৩৮ হেক্টর ভূমি অধিগ্রহণ করা হবে। উপকূলীয় অঞ্চলের সুরক্ষায় ৩ দশমিক ৪৬০ কিলোমিটার টেকসই বাঁধ নির্মাণ এবং ২ দশমিক ৭৩০ কিলোমিটার তীর সংরক্ষণ (ব্লক বা জিওব্যাগ দ্বারা) কাজ সম্পন্ন করা হবে। যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নে ২ দশমিক ৭৩০ কিলোমিটার মেরিন ড্রাইভ বা সড়ক নির্মাণ করা হবে। এছাড়া, খন্ডন ও নিষ্কাশন ব্যবস্থার অংশ হিসেবে ১ দশমিক ৬০০ কিলোমিটার খাল খনন এবং পানি নিষ্কাশনের জন্য একটি আধুনিক 'দুই ভেন্ট বিশিষ্ট রেগুলেটর' স্থাপন করা হবে।
এই প্রকল্পটির সুদূরপ্রসারী সুফলের মধ্যে রয়েছে লবণাক্ত পানির প্রবেশ রোধ করে কৃষি জমির সুরক্ষা, সাইক্লোন মোকাবিলার সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং স্থানীয় সাপমারা খালে মাছ ধরার ট্রলারগুলোর জন্য একটি নিরাপদ প্রাকৃতিক পোতাশ্রয় বা আশ্রয়স্থল তৈরি করা।
অনুমোদন প্রক্রিয়ায় গতি, কাজ শুরুর অপেক্ষা
প্রকল্পের সময়কাল ও অগ্রগতি নিয়ে চট্টগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ডের (বিভাগ-১) নির্বাহী প্রকৌশলী শওকত ইবনে সাহীদ অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক তথ্য দিয়েছেন। তিনি বলেন, “পারকি সৈকত ও টানেল সংলগ্ন এই ৩ কিলোমিটার এলাকাটি কৌশলগতভাবে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। আমরা ৫৪৮ কোটি টাকার এই প্রকল্পটির একটি প্রস্তাবনা বোর্ডে জমা দিয়েছিলাম। বোর্ড থেকে কিছু টেকনিক্যাল সংশোধনী দেওয়া হয়েছে, যা আমরা দ্রুততম সময়ের মধ্যে সংশোধন করে পাঠাচ্ছি। বর্তমানে এর চূড়ান্ত ডিজাইন বা নকশা প্রস্তুতের কাজ চলছে।”
তিনি আরও জানান, প্রকল্পটি বর্তমানে চূড়ান্ত অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। সরকারি অনুমোদন সম্পন্ন হলে আগামী জুলাই ২০২৬ থেকে কাজ শুরু হয়ে ২০২৮ থেকে ২০২৯ সালের মধ্যে পুরো মেগা প্রজেক্টের কাজ শেষ করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
এটি সফলভাবে শেষ হলে পারকি বিচ তার পুরোনো রূপ এবং চিরচেনা সৌন্দর্য ফিরে পাবে।