ইসলামী ব্যাংক থেকে গ্রাহকদের টাকা তুলে নেওয়ার ধুম; ৫ দিনে তুলে নিয়েছেন ৩,৫০০ কোটি টাকা
ফটো: সংগৃহীত
গ্রাহকদের মধ্যে বাড়তে থাকা চরম অস্থিরতা ও আস্থার সংকটের মুখে দেশের শীর্ষস্থানীয় বেসরকারি ব্যাংক ‘ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি’ থেকে মাত্র পাঁচ কার্যদিবসে ৩ হাজার ৫০০ কোটি টাকারও বেশি অর্থ তুলে নেওয়া হয়েছে।
ব্যাংকটির নতুন চেয়ারম্যান হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর মো. খুরশিদ আলম নিয়োগ পাওয়ার পর থেকে আমানত উত্তোলনের এই নজিরবিহীন চাপ আরও তীব্র হয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
ব্যাংকটির ঊর্ধ্বতন সূত্র জানায়, গত ২৪ মে মো. খুরশিদ আলমকে চেয়ারম্যান নিয়োগ দেওয়ার পর থেকেই গ্রাহকদের মধ্যে টাকা তোলার প্রবণতা দ্রুত বাড়ে।
দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রথম চার কার্যদিবসে (১ থেকে ৪ জুন) গ্রাহকেরা প্রায় ২ হাজার ৫৭০ কোটি টাকা তুলে নেন। এছাড়া দেশের বিভিন্ন শাখা থেকে পাওয়া প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, গতকাল এক দিনেই আরও প্রায় ১ হাজার কোটি টাকা উত্তোলন করা হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
খুরশিদ আলমের এই নিয়োগকে কেন্দ্র করে 'ইসলামী ব্যাংক সচেতন গ্রাহক ফোরাম'-এর ব্যানারে ব্যাংকটির প্রধান কার্যালয়ের সামনে তীব্র বিক্ষোভ শুরু হয়, যার কারণে ১ জুন খুরশিদ আলম তাঁর প্রথম কর্মদিবসে সশরীরে উপস্থিত হতে পারেননি এবং ওই দিনের নির্ধারিত বোর্ড সভাটি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশে অনলাইনে সম্পন্ন হয়। একই দিনে ব্যাংক কর্মকর্তাদের বিক্ষোভের মুখে তৎকালীন চেয়ারম্যান জুবাইদুর রহমান পদত্যাগ করেন।
পরিস্থিতি স্বীকার করে ইসলামী ব্যাংকের অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক আলতাফ হোসেন গ্রাহকদের আতঙ্কিত না হওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেন, “এই মুহূর্তে আতঙ্কিত হয়ে টাকা তোলার কোনো কারণ নেই। বর্তমানে যেকোনো ঋণ অনুমোদন কঠোর যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।”
পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনার জন্য গতকাল বিকেলে আলতাফ হোসেনকে বাংলাদেশ ব্যাংকে তলব করা হয় এবং গভর্নরের সঙ্গে তাঁর একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।
অন্যদিকে, বাংলাদেশ ব্যাংকের সহকারী মুখপাত্র মোহাম্মদ শাহরিয়ার সিদ্দিকী জানান, কেন্দ্রীয় ব্যাংক ইসলামী ব্যাংককে নিবিড় পর্যবেক্ষণে রেখেছে। ব্যাংকটি এমন অবস্থায় নেই যে তারা উত্তোলনের চাহিদা পূরণ করতে পারবে না; যদি কোনো তারল্য সংকট দেখা দেয়, তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক অবশ্যই সহায়তা দেবে।
এর আগে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের পর ব্যাংকটির বোর্ড পুনর্গঠন করা হলে পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হয়েছিল এবং ২০২৫ সালে ব্যাংকের মোট আমানত বেড়ে ১ লাখ ৮৩ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছেছিল। তবে নতুন চেয়ারম্যানের নিয়োগের মাত্র ৫ দিনের মাথায় ব্যাংকটি প্রায় ৩ হাজার ৫০০ কোটি টাকার আমানত হারাল।
এদিকে নতুন চেয়ারম্যানের নিয়োগ বাতিলের দাবিতে ব্যাংকটির কর্মকর্তা ও গ্রাহকদের বিক্ষোভ এখনো অব্যাহত রয়েছে।
গতকাল (৭ জুন) মতিঝিলে ইসলামী ব্যাংক টাওয়ারের সামনে আয়োজিত এক সমাবেশ থেকে বিক্ষোভকারীদের প্ল্যাটফর্মের সভাপতি নূর নবী মানিক নতুন কর্মসূচি ঘোষণা করে বলেন, খুরশিদ আলমকে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে পদত্যাগ করতে হবে। এর অংশ হিসেবে আজ সকাল ১০টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত দেশব্যাপী দুই ঘণ্টার 'কলম বিরতি' ও অবস্থান কর্মসূচি পালনের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। বিক্ষোভকারীদের দাবি, কথিত অনিয়মের মাধ্যমে এস আলম গ্রুপের অধিগৃহীত ইসলামী ব্যাংকের ৮২ শতাংশ শেয়ার বিক্রি করে বকেয়া ঋণ সমন্বয় করতে হবে এবং কোনো ঋণখেলাপি বা অভিযুক্ত পরিচালককে বোর্ডে রাখা যাবে না।
সার্বিক বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যাংকিং রেগুলেশন অ্যান্ড পলিসি ডিপার্টমেন্ট (বিআরপিডি)-এর পরিচালক মো. আলাউদ্দিন বলেন, পরিচালক নিয়োগ অনুমোদন পর্যন্তই তাঁদের বিভাগের দায়িত্ব সীমাবদ্ধ, তবে আমানত উত্তোলনের বিষয়টি তাঁরা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানাবেন।
সাম্প্রতিক এই পরিস্থিতি এমন এক সময়ে ঘটছে, যখন সামগ্রিকভাবে ব্যাংকিং খাতের বাইরে নগদ অর্থ রাখার প্রবণতা সাধারণ মানুষের মধ্যে ক্রমেই বাড়ছে।