কর্ণফুলীতে তেল চোরাচালানের অদৃশ্য সাম্রাজ্য, থামছে না সিন্ডিকেট
কর্ণফুলী নদীতে শতাধিক তেল চোর চক্র সক্রিয়। দেশি-বিদেশি জাহাজকে লক্ষ্য করে তারা প্রতি মাসে বিপুল পরিমাণ তেল লোপাট করছে, যার বার্ষিক আর্থিক পরিমাণ হাজার কোটি টাকার বেশি।
চট্টগ্রাম বন্দর | ফটো: সংগৃহিত
কর্ণফুলী নদী ও চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙর এলাকাকে ঘিরে গড়ে ওঠা তেল চোরাচালান সিন্ডিকেট দীর্ঘ প্রায় আড়াই দশকেও নিয়ন্ত্রণে আনা যায়নি। লাইসেন্স ও অনুমোদনের আড়ালে বৈধতার ছাপ থাকলেও বাস্তবে এখানে একটি সুসংগঠিত অবৈধ বাণিজ্য পরিচালিত হচ্ছে। প্রতিবছর হাজার হাজার কোটি টাকার জ্বালানি তেল চুরি ও পাচারের মাধ্যমে একটি অদৃশ্য অর্থনৈতিক নেটওয়ার্ক গড়ে উঠেছে, যা সময়ের সঙ্গে আরও শক্তিশালী হয়েছে।
কর্ণফুলী নদীতে শতাধিক তেল চোর চক্র সক্রিয়। দেশি-বিদেশি জাহাজকে লক্ষ্য করে তারা প্রতি মাসে বিপুল পরিমাণ তেল লোপাট করছে, যার বার্ষিক আর্থিক পরিমাণ হাজার কোটি টাকার বেশি। এতে জাহাজ মালিকরা বড় ক্ষতির মুখে পড়ছেন এবং সরকার হারাচ্ছে উল্লেখযোগ্য রাজস্ব।
চট্টগ্রাম বন্দরকে কেন্দ্র করে দেশের জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থার বড় অংশ পরিচালিত হয়। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশনের অধীনে পদ্মা অয়েল, মেঘনা পেট্রোলিয়াম ও যমুনা অয়েলের মাধ্যমে আমদানিকৃত তেল সারা দেশে পৌঁছায়। তবে এই সরবরাহ ব্যবস্থার প্রতিটি ধাপেই চুরির সুযোগ রয়েছে। ড্রামপ্রতি অতিরিক্ত তেল সরিয়ে নেওয়া দীর্ঘদিনের একটি প্রচলিত কৌশল।
এছাড়া বহির্নোঙরে থাকা বিদেশি জাহাজ থেকে অতিরিক্ত তেল সংগ্রহ করে স্থানীয় বাজারে বিক্রির মাধ্যমে একটি সমান্তরাল বাজার গড়ে উঠেছে। শুল্ক ফাঁকি দিয়ে কম দামে সংগ্রহ করা এই তেল পরে পেট্রোল পাম্প, শিল্পকারখানা ও বিভিন্ন জাহাজে বিক্রি করা হয়। পুরো প্রক্রিয়ায় জাহাজের নাবিক, ডিপোর কিছু কর্মী, পরিবহন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও স্থানীয় প্রভাবশালীরা জড়িত বলে অভিযোগ রয়েছে।
প্রতিদিন প্রায় ৫০ হাজার লিটার চোরাই তেল কেনাবেচা হয় বলে জানা গেছে। এই তেল বিভিন্ন উৎস থেকে সংগ্রহ করে কম দামে কিনে বেশি দামে বিক্রি করা হয়। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতির পর তেলের চাহিদা বাড়ায় এই অবৈধ কার্যক্রম আরও বিস্তৃত হয়েছে। কর্ণফুলীর বিভিন্ন ঘাটে রাতে গোপনে তেল খালাস করা হয়।
পতেঙ্গা, ইপিজেড, কর্ণফুলী, বাকলিয়া, কোতোয়ালী ও বন্দর এলাকাকে কেন্দ্র করে এই সিন্ডিকেট পরিচালিত হচ্ছে। এ নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তির নামও উঠে এসেছে, যাদের বিরুদ্ধে তেল চুরি, চাঁদাবাজি ও অন্যান্য অপরাধের অভিযোগ রয়েছে। তাদের মধ্যে একজন দীর্ঘদিন ধরে এই ব্যবসায় আধিপত্য বিস্তার করে বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন।
অভিযোগ রয়েছে, রাজনৈতিক পরিবর্তনের পরও এই সিন্ডিকেটের কাঠামো খুব একটা বদলায়নি; বরং নিয়ন্ত্রণের হাতবদল হয়েছে মাত্র। স্থানীয়দের মতে, সন্ধ্যার পর থেকেই নদীতে সন্দেহজনক নৌচলাচল বেড়ে যায়, তবে ভয়ের কারণে কেউ প্রকাশ্যে কথা বলতে চান না।
এদিকে চোরাই তেলের কারণে দুর্ঘটনার ঝুঁকি ও পরিবেশগত ক্ষতির আশঙ্কাও বাড়ছে। অনিরাপদ সংরক্ষণ ও পরিবহনের ফলে বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা।
স্থানীয় প্রশাসন ও নিরাপত্তা বাহিনীর কিছু সদস্যকে ম্যানেজ করার অভিযোগও রয়েছে, যদিও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নিয়মিত অভিযান চালানোর কথা জানিয়েছে। মাঝেমধ্যে তেল জব্দ করা হলেও স্থায়ীভাবে এই চক্র দমন করা যাচ্ছে না।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এটি কোনো বিচ্ছিন্ন অপরাধ নয়, বরং একটি সুসংগঠিত অর্থনৈতিক অপরাধচক্র। কার্যকর নজরদারি, দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত প্রশাসন ছাড়া এই নেটওয়ার্ক ভেঙে ফেলা কঠিন হবে। অন্যথায় এটি দেশের অর্থনীতি ও জ্বালানি খাতের জন্য দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি তৈরি করবে।