পদ্মা-যমুনায় কোটি কোটি টাকা টোল, কর্ণফুলী টানেলে হাহাকার
বর্তমানে কেইপিজেডের (KEPZ) শ্রমিকদের কিছু গাড়ি ও সীমিত পণ্যবাহী গাড়িই এর মূল ভরসা।
ফটো: সংগৃহীত
পবিত্র ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহার মতো বড় ধর্মীয় উৎসবগুলোতে টানা ছুটিতে রাজধানীসহ বিভিন্ন শহর ছেড়ে লাখ লাখ মানুষ গ্রামমুখী হয়। এমন লম্বা ছুটিতে স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে দেশের বড় বড় মহাসড়ক ও সেতুতে গাড়ির চাপ দুই থেকে তিন গুণ পর্যন্ত বেড়ে যায়।
তবে এবারের ঈদুল আজহার ছুটিতে দেশের যোগাযোগ অবকাঠামোর এই চিরচেনা চিত্রের সম্পূর্ণ বিপরীত রূপ দেখা গেছে কর্ণফুলী নদীর তলদেশে নির্মিত দেশের প্রথম সুড়ঙ্গপথ ‘কর্ণফুলী টানেলে’। উৎসব বা লম্বা ছুটিতে পদ্মা ও যমুনা সেতুতে গাড়ির ঢল নামলেও, কর্ণফুলী টানেলে গাড়ির সংখ্যায় কোনো উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আসেনি।
বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের (বিবিএ) তথ্য অনুযায়ী, এবারের পবিত্র ঈদুল আজহার সাত দিনের লম্বা ছুটিতে দেশের একমাত্র দূরপাল্লার এই আন্ডারওয়াটার টানেল দিয়ে সর্বমোট ৩১ হাজার ৮৮৯টি গাড়ি চলাচল করেছে। অর্থাৎ, ছুটির দিনগুলোতে প্রতিদিন গড়ে গাড়ি চলেছে ৪ হাজার ৫৫৫টি। যেখানে স্বাভাবিক সময়ে প্রতিদিন গড়ে এই টানেলে গাড়ি পারাপার হয় ৩ হাজার ৮০০ থেকে ৩ হাজার ৯০০টি। অর্থাৎ, ঈদের ছুটিতে টানেলে গাড়ির সংখ্যা সামান্যই বেড়েছে।
এর সম্পূর্ণ বিপরীত চিত্র দেখা গেছে দেশের অন্য দুটি মেগা সেতুতে। ঈদের ছুটির একই সময়ে পদ্মা সেতু দিয়ে পার হয়েছে রেকর্ড ২ লাখ ৪৪ হাজার গাড়ি, যেখান থেকে টোল আদায় হয়েছে ২৪ কোটি ৭৫ লাখ টাকা। অন্যদিকে, যমুনা (বঙ্গবন্ধু) সেতু দিয়ে চলাচল করেছে ২ লাখ ৫৮ হাজারের বেশি গাড়ি এবং টোল আদায় হয়েছে ১৭ কোটি টাকা। এই দুটি সেতু দিয়ে স্বাভাবিক সময়ে দিনে ১৭ থেকে ১৮ হাজার গাড়ি চলাচল করলেও, ঈদের ছুটিতে তা বেড়ে ৪৫ থেকে ৫০ হাজার পর্যন্ত পৌঁছে যায়, যার ফলে টোল আদায়ও কোটি কোটি টাকা বৃদ্ধি পায়।
কিন্তু ১০ হাজার ৬৮৯ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত কর্ণফুলী টানেল থেকে এবারের ঈদুল আজহার ৭ দিনে টোল এসেছে মাত্র ৯৫ লাখ ৮০ হাজার টাকা।
লক্ষ্যমাত্রার ধারেকাছেও নেই টানেল
টানেলের সম্ভাব্যতা সমীক্ষা (ফিজিবিলিটি স্টাডি) প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, চালুর পর প্রতিদিন গড়ে ১৯ হাজার ৬৬৯টি করে গাড়ি যাতায়াত করবে।
তবে ২০২৩ সালের ২৯ অক্টোবর যান চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করার পর থেকে লক্ষ্যমাত্রার ধারেকাছেও যেতে পারেনি এই টানেল। চালুর পর থেকে গত ২৩ মে পর্যন্ত মোট ৩৬ লাখ ২৮ হাজার ২২২টি গাড়ি এই সুড়ঙ্গপথ ব্যবহার করেছে, যার অর্থ প্রতিদিন গড়ে গাড়ি চলেছে মাত্র ৩ হাজার ৮৬৮টি। আর এই দীর্ঘ সময়ে মোট টোল আদায় হয়েছে ১০৫ কোটি ১ লাখ টাকা, যেখানে দৈনিক গড় আয় ১১ লাখ ১৯ টাকা।
বড় ছুটিতেও কেন ফাঁকা থাকে টানেল?
স্বাভাবিক সময়ের পাশাপাশি বড় উৎসবের ছুটিতেও কেন টানেলে গাড়ি বাড়ছে না, তার পেছনে বেশ কয়েকটি বড় কারণ দেখছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও পরিবহন মালিকেরা।
সেতু কর্তৃপক্ষের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, ঈদের সময় মহাসড়কগুলোতে ভারী পণ্যবাহী যান চলাচল বন্ধ রাখা হয়। টানেলের প্রধান ব্যবহারকারী এই বাণিজ্যিক গাড়িগুলো বন্ধ থাকায় ছুটির দিনে গাড়ির সংখ্যা উল্টো আরও কমে যায়।
টানেলকে কেন্দ্র করে কর্ণফুলীর ওপারে ‘ওয়ান সিটি টু টাউন’ বা শহর সম্প্রসারণের কথা বলা হলেও বাস্তবে তা এখনো হয়নি। আনোয়ারা প্রান্তে বড় আকারের কোনো শিল্পায়ন বা নতুন কল-কারখানা গড়ে ওঠেনি এবং মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরও পুরোপুরি চালু হয়নি।
চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পরিবহন মালিক গ্রুপের সভাপতি বেলায়েত হোসেন জানান, ঢাকা থেকে কক্সবাজার বা বান্দরবানমুখী দূরপাল্লার বাসগুলোর কাউন্টার মূলত চট্টগ্রাম শহরের জিইসি মোড়, বহদ্দারহাট ও নতুন ব্রিজ (শাহ আমানত সেতু) এলাকায়। ফলে বাসগুলো যাত্রী নেওয়ার সুবিধার্থে শহরের ভেতর দিয়ে গিয়ে শাহ আমানত সেতু ব্যবহার করে। টানেল দিয়ে গেলে তাদের বাড়তি পথ ঘুরতে হয় এবং কোনো যাত্রীও পাওয়া যায় না।
আনোয়ারা থেকে চন্দনাইশ পর্যন্ত বাইপাস সড়কটি এখনো প্রশস্ত বা পুরোপুরি তৈরি না হওয়ায় ঢাকা-কক্সবাজার রুটের গাড়িগুলো এই পথ ব্যবহার করতে পারছে না।
চট্টগ্রাম সিটি সার্ভিস ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি তরুণ দাশ গুপ্ত বলেন, “টানেলের পূর্ণ ব্যবহারের জন্য নদীর ওপারে বড় আকারের শিল্পায়নের কোনো বিকল্প নেই। বর্তমানে কেইপিজেডের (KEPZ) শ্রমিকদের কিছু গাড়ি ও সীমিত পণ্যবাহী গাড়িই এর মূল ভরসা। শিল্পকারখানা ও শহর সম্প্রসারিত না হলে মানুষের আনাগোনা বাড়বে না, আর তা না হলে ঈদের ছুটিতেও এখানে গাড়ি বাড়বে না।”
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, আনোয়ারা-চন্দনাইশ বাইপাস সড়ক ও ওপারে শিল্পায়ন না হলে আগামী ২-৩ বছরের মধ্যে টানেলে গাড়ি বাড়ার সম্ভাবনা খুবই কম।
সূত্রঃ প্রথম আলো