ইউরোপজুড়ে তীব্র তাপপ্রবাহঃ গলে যাচ্ছে সড়ক, বেঁকে গেছে রেললাইন
দক্ষিণ ইউরোপের দেশ ইতালির রোম, মিলান, ভেনিস ও ফ্লোরেন্সসহ ১৮টি গুরুত্বপূর্ণ শহরে বর্তমানে সর্বোচ্চ মাত্রার রেড অ্যালার্ট বহাল রাখা হয়েছে।
ফটো: সংগৃহিত
ইউরোপজুড়ে চলমান তীব্র তাপপ্রবাহে চরম বিপর্যয় নেমে এসেছে বিভিন্ন দেশের অবকাঠামো ও জনজীবনে। রেকর্ড ভাঙা তাপমাত্রার কারণে কোথাও সড়ক গলতে শুরু করেছে, আবার কোথাও বেঁকে গেছে ট্রাম ও রেললাইন। এতে মহাদেশটির সড়ক ও রেল যোগাযোগ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থা ও হাসপাতালগুলোতে চাপ আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের প্রতিবেদন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া চিত্রে দেখা গেছে, বেশ কয়েকটি দেশে তাপমাত্রা ইতোমধ্যে ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়িয়ে গেছে, যার ফলে যাতায়াত ব্যবস্থা ও জনস্বাস্থ্য চরম ঝুঁকির মুখে পড়েছে।
আবহাওয়াবিদদের তথ্য অনুযায়ী, চলতি সপ্তাহের শুরুতে পশ্চিম ইউরোপে আঘাত হানা এই দাবদাহ ধীরে ধীরে এখন মধ্য ও পূর্ব ইউরোপে ছড়িয়ে পড়ছে। ডেনমার্কে ১৮৭৪ সালে আবহাওয়ার রেকর্ড রাখা শুরু হওয়ার পর এবারই ইতিহাসের সর্বোচ্চ ৩৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে। এছাড়া সুইজারল্যান্ডের বাসেলে পারদ পৌঁছেছে ৩৮ দশমিক ৮ ডিগ্রিতে এবং চেক প্রজাতন্ত্রের ডোকসানিতে রেকর্ড করা হয়েছে দেশটির ইতিহাসের সর্বোচ্চ ৪০ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস। যুক্তরাজ্যেও গত শুক্রবার ১৯৭৬ সালের রেকর্ড ভেঙে ইতিহাসের সবচেয়ে উষ্ণ জুন মাস প্রত্যক্ষ করেছে দেশবাসী, যেখানে তাপমাত্রা ছিল ৩৭ দশমিক ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস।
প্রচণ্ড এই গরমের সবচেয়ে বড় ধাক্কা লেগেছে জার্মানি ও ফ্রান্সের পরিবহন এবং জ্বালানি খাতে। জার্মানির বার্লিনের বাইরে এ-২ মোটরওয়েতে অতিরিক্ত গরমে কংক্রিটের স্ল্যাব ফেটে যাওয়ায় মহাসড়কের কিছু অংশ বন্ধ করে দিতে হয়েছে। পরিস্থিতি বিবেচনায় দেশের রেল অপারেটর ডয়চে বান জরুরি প্রয়োজন ছাড়া যাত্রীদের ট্রেনে ভ্রমণ না করার পরামর্শ দিয়েছে। অন্যদিকে ফ্রান্সেও সড়ক গলে যাওয়া এবং ট্রেন চলাচলে দীর্ঘ বিলম্বের খবর পাওয়া গেছে। ফরাসি রাষ্ট্রায়ত্ত বিদ্যুৎ কোম্পানি ইডিএফ জানিয়েছে, পারমাণবিক চুল্লির শীতলীকরণ ব্যবস্থায় জটিলতা দেখা দেওয়ায় কয়েকটি কেন্দ্রের বিদ্যুৎ উৎপাদন সাময়িকভাবে কমিয়ে দেওয়া হয়েছে।
তীব্র এই গরমের কারণে ইউরোপের স্বাস্থ্যসেবা খাতও চরম চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। জার্মানির ডরমাগেন শহরের একটি নার্সিং হোমের কক্ষের তাপমাত্রা ৩৫ ডিগ্রিতে পৌঁছালে বাসিন্দাদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়, যেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় এক বৃদ্ধের মৃত্যু হয়েছে। ফ্রান্সে তাপমাত্রা কিছুটা কমলেও রাজধানী প্যারিসসহ ৩৭টি অঞ্চলে সর্বোচ্চ মাত্রার তাপ সতর্কতা জারি রয়েছে। সেখানে টানা দুই দিনে প্রায় ৩ হাজার রোগী জরুরি বিভাগে চিকিৎসা নিয়েছেন, যা স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে এক-তৃতীয়াংশ বেশি। এই চাপ সামাল দিতে প্যারিসের ৩৮টি সরকারি হাসপাতালে জরুরি স্বাস্থ্য পরিকল্পনা কার্যকর করার পাশাপাশি প্যারিস প্রাইড মিছিল ও তিন দিনের একটি বৃহৎ সংগীত উৎসব বাতিল করা হয়েছে।
দক্ষিণ ইউরোপের দেশ ইতালির রোম, মিলান, ভেনিস ও ফ্লোরেন্সসহ ১৮টি গুরুত্বপূর্ণ শহরে বর্তমানে সর্বোচ্চ মাত্রার রেড অ্যালার্ট বহাল রাখা হয়েছে। অন্যদিকে যুক্তরাজ্যে সপ্তাহান্তে আবহাওয়ার কিছুটা উন্নতির পূর্বাভাস থাকলেও ‘অ্যাম্বার হিট ওয়ার্নিং’ কার্যকর রাখা হয়েছে। দেশটিতে তীব্র গরমে নদী ও হ্রদে সাঁতার কাটতে গিয়ে গত শনিবারে এক তরুণ ও এক কিশোরের মৃত্যুসহ চলতি সপ্তাহে তাপপ্রবাহ-সংশ্লিষ্ট মোট মৃত্যুর সংখ্যা চারে দাঁড়িয়েছে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষকে কোনো ধরনের লাইফগার্ডবিহীন বা অরক্ষিত জলাশয়, নদী ও হ্রদে সাঁতার না কাটার জন্য বিশেষভাবে সতর্ক করেছে ব্রিটিশ প্রশাসন।