অর্থ অপচয় রোধ ও দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার দাবি ড. শফিকুর রহমানের
জাতীয় সংসদের গুরুত্ব ও তাৎপর্য তুলে ধরে ড. শফিকুর রহমান বলেন, “এই সংসদটি অত্যন্ত ব্যতিক্রমী এবং আমরা এটিকে মজলুমের মিলনমেলা বলে বিশ্বাস করি।”
ফটো: সংগৃহীত
জাতীয় সংসদকে দেশের মানুষের হতাশা দূর ও আস্থা ফিরিয়ে আনার প্রধান চাবিকাঠি হিসেবে বর্ণনা করেছেন বিরোধীদলীয় নেতা ড. শফিকুর রহমান। একই সাথে তিনি স্পিকারের অভিভাবকত্বকে আরও বলিষ্ঠ করার অনুরোধ জানান এবং রাষ্ট্রীয় অর্থ অপচয় রোধ, সুষম উন্নয়ন ও দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ গড়তে সরকারের নীতিগত ও কার্যকর উদ্যোগ দাবি করেন।
আজ বুধবার (১৫ জুলাই) জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় অধিবেশনের বাজেট সমাপনী বক্তব্যে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আলোকপাত করার সময় তিনি এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠিত এই অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল।
জাতীয় সংসদের গুরুত্ব ও তাৎপর্য তুলে ধরে ড. শফিকুর রহমান বলেন, “এই সংসদটি অত্যন্ত ব্যতিক্রমী এবং আমরা এটিকে মজলুমের মিলনমেলা বলে বিশ্বাস করি।” সংসদের কার্যক্রম যত বেশি সুন্দর ও নিয়মতান্ত্রিকভাবে চলবে, দেশের মানুষের মন থেকে হতাশা তত দ্রুত দূর হবে এবং তারা দেশ গড়ার কাজে অনুপ্রাণিত হবে উল্লেখ করে সংসদীয় কার্যপ্রণালী বিধি নিশ্চিত করতে স্পিকারকে একজন বলিষ্ঠ কমান্ডারের ভূমিকা পালনের আহ্বান জানান তিনি।
বাজেট ও গুরুত্বপূর্ণ বিল পাশের প্রসঙ্গে ক্ষোভ প্রকাশ করে বিরোধীদলীয় নেতা অভিযোগ করেন, সম্প্রতি বেকারত্ব দূরীকরণ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির মতো একটি অত্যন্ত জনগুরুত্বপূর্ণ বিল সংসদে পাশ হলেও, সেটির ওপর বিস্তারিত আলোচনা ও অংশগ্রহণ করার সুনির্দিষ্ট সুযোগ থেকে বিরোধী দলকে বঞ্চিত করা হয়েছে। ভবিষ্যতে এ ধরনের প্রতিবন্ধকতা না রেখে বিরোধী দলের সদস্যদের যথাযথভাবে দায়িত্ব পালনের সুযোগ দেওয়ার অনুরোধ জানিয়ে তিনি বলেন, অন্যথায় সংসদে বসা কেবল জনগণের অর্থ ও সময়ের অপচয় ছাড়া আর কোনো উপকারে আসবে না।
উন্নয়ন বরাদ্দের ক্ষেত্রে সুষম বণ্টনের জোরালো দাবি জানিয়ে বিরোধীদলীয় নেতা সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর নজরে এনে বলেন, সরকারের বিভিন্ন আর্থিক পদক্ষেপে বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্যদের প্রতি ইনসাফ করা হয়নি। সংরক্ষিত আসনের সরকারি দলের সদস্যদের বড় অংকের ফান্ড বা বরাদ্দ দেওয়া হলেও বিরোধী দলের কাউকে তা দেওয়া হয়নি। তিনি স্পষ্ট ভাষায় স্মরণ করিয়ে দেন যে, বিএনপির ৩১ দফা এবং নির্বাচনী ইশতেহারে সুষম উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি রয়েছে এবং তারা সেই সুষম বণ্টনটাই প্রত্যাশা করেন।
সাম্প্রতিক প্রাকৃতিক বিপর্যয় নিয়ে দুঃখ প্রকাশ করে ড. শফিকুর রহমান বন্যায় ও ভূমিধসে নিহতদের পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান। তিনি উল্লেখ করেন, এবারের বন্যায় চারটি বিভাগ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হলেও চট্টগ্রামের ক্ষয়ক্ষতি ছিল সবচেয়ে বেশি। তাই নিহতদের পরিবারকে বিশেষ আর্থিক প্রণোদনা দেওয়ার জন্য তিনি প্রধানমন্ত্রী ও অর্থমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেন এবং অর্থমন্ত্রী চট্টগ্রামের সন্তান হিসেবে এই ক্ষতি পুষিয়ে নিতে অতিরিক্ত দায়িত্বশীলতার পরিচয় দেবেন বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
রাজধানী ঢাকার নাজুক পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা ও জলাবদ্ধতা নিয়ে তীব্র সমালোচনা করে তিনি বলেন, একটু বৃষ্টি হলেই ঢাকা শহর ময়লা ও ড্রেনের পানিতে ভেসে যায়, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য চরম হুমকি। ঢাকাকে দেশের ‘চেহারা’ হিসেবে বর্ণনা করে তিনি বলেন, বিদেশী অতিথিরা ঢাকা দেখেই পুরো দেশ সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা পান। তাই ঢাকাকে দৃষ্টিনন্দন করতে বাজেটে বিশেষ বরাদ্দ রাখা এবং একটি সুনির্দিষ্ট ও সমন্বিত মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা অত্যন্ত জরুরি।
শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধির প্রশংসা করার পাশাপাশি প্রাথমিক ও উচ্চশিক্ষার ওপর সর্বোচ্চ জোর দেওয়ার কথা উল্লেখ করেন বিরোধীদলীয় নেতা। তিনি প্রাথমিক স্তরে সব ধর্মের শিক্ষার্থীদের জন্য নৈতিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধের শিক্ষা নিশ্চিত করতে ধর্মীয় শিক্ষক নিয়োগ এবং অবহেলিত স্বতন্ত্র মাদ্রাসাসমূহের উন্নয়নে নজর দেওয়ার তাগিদ দেন। একই সাথে রাজনৈতিক বিবেচনায় অযোগ্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে এমপিওভুক্ত করার সংস্কৃতি থেকে বের হয়ে আসার অনুরোধ জানান।
সরকারি অর্থ অপচয় এবং উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে নিজেদের নামফলক বসানোর প্রাচীন কালচার নিয়ে কঠোর সমালোচনা করে তিনি বলেন:
"সরকারি টাকায় কোনো ব্যক্তি বা রাজনীতিকের নামে স্থাপনার নামফলক বসানোর সংস্কৃতি বন্ধ হওয়া উচিত। সরকারের পট পরিবর্তনের সাথে সাথে শত শত কোটি টাকার সরকারি সম্পদ নষ্ট করে নামফলক পরিবর্তনের এই অপরাজনীতি দেশের জন্য চরম ক্ষতি ডেকে আনে। কারো যদি নিজের নামের মোহ থাকে, তবে তিনি নিজের টাকা ও জমিতে জনকল্যাণমূলক প্রতিষ্ঠান গড়ে নাম দিতে পারেন।"
দেশের অন্যতম প্রধান সমস্যা ‘দুর্নীতি’ নিয়ে কঠোর অবস্থান নেওয়ার দাবি জানিয়ে ড. শফিকুর রহমান অর্থমন্ত্রীর পূর্ববর্তী সফল কর্মযজ্ঞের প্রশংসা করেন এবং আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে দুর্নীতির শিকড় উপড়ে ফেলার তাগিদ দেন। প্রধানমন্ত্রী যেখানে বলেছেন দুর্নীতির টুটি চেপে ধরবেন, সেখানে বিরোধীদলীয় নেতা পরামর্শ দিয়ে বলেন, আপাতত দুর্নীতির হাত চেপে ধরুন এবং হাতকড়া পরিয়ে কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করুন, যাতে আর কেউ জনসম্পদ লুটের সাহস না পায়।
সবশেষে, জুলাই বিপ্লব ও ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের স্মৃতি সংরক্ষণে 'জুলাই স্মৃতি জাদুঘর' প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করায় প্রধানমন্ত্রীকে অগ্রিম ধন্যবাদ জানান তিনি। একই সাথে সংসদ সচিবালয়ের সকল কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের অক্লান্ত পরিশ্রমের স্বীকৃতিস্বরূপ নিয়মিত রেওয়াজ অনুযায়ী এক মাসের মূল বেতনের সমপরিমাণ বিশেষ ইনসেন্টিভ বা বোনাস প্রদানের জোর দাবি জানিয়ে বিরোধীদলীয় নেতা তাঁর বক্তব্য সমাপ্ত করেন।